bangla sera galpo, bangla upponnash, bangla poem, bangla novel, premer golpo, sera bani, love quate, top bangla poem, recent abrritti, best poettry,
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অসামান্য গল্প
"অভিদার কথা" (১ম--পর্ব)
তবে ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইডের মতন অতটা নয়। তবে কোনও খুনটুন করিনি।
আমি ভালো লোক, আবার এই আমিই ঝোঁকের মাথায় এমন এক-একটা কাণ্ড করে ফেলি,
যাতে আমার নিজেরই চরম ক্ষতি হবে, শেষ মুহূর্তে সেটা আমি বুঝি তবু জেদের বশে থামি না।
কেন যে এরকম করি, তার যুক্তি খুঁজে পাই না।
এক-একসময় স্বেচ্ছায় বিপদ ডেকে আনি, যেন এটা আমার খেলা। আমার এক বন্ধু ডাক্তার। সে বলে, আমার মধ্যে নাকি আত্মহত্যা করার প্রবণতা আছে। হঠাৎ এত নামডাক, আর টাকাপয়সা পাওয়া আমার সহ্য হচ্ছে না। কথাটা ঠিক বলে মনে হয় না। আমি কক্ষনও আত্মহত্যার চেষ্টা করিনি, সে চিন্তাও মাথায় আসে না। যা কিছু পেয়েছি, তা নিজের চেষ্টায় নিজের ক্ষমতার জোরে পেয়েছি, এ ব্যাপারে আমার কোনও হীনম্মন্যতাও নেই।
আমি হইচই ভালোবাসি, আবার নির্জনতাও ভালোবাসি। মুম্বইয়ের জীবন সবসময় উদ্দাম, বিশেষত আমাদের লাইনে। সবসময় সবাই ছুটছে, থামবার উপায় নেই। রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত জাগা, মদ্যপান, মেয়েদের নিয়ে হুল্লোড়, এসব তো লেগেই আছে। আমি খুব পছন্দ করি এইসব, লোকে জানে, আমি এক নম্বর হুল্লোড়বাজ।
আবার এক-একসময় এইসবে দারুণ বিতৃষ্ণা জন্মে যায়। টানা দশ-পনেরো দিন চেনা কোনও লোকের সঙ্গে কথা বলতেই ইচ্ছে করে না। টেলিফোনের আওয়াজে গায়ে যেন হুল ফোটে। ফিলম লাইনের সবাই জানে, আমি মাঝে-মাঝে রহস্যময়ভাবে উধাও হয়ে যাই কয়েকদিনের জন্য। কোথায় যাই, কেউ টের পায় না।
সেসব সময়ে আমি কোনও হোটেলেও উঠি না। আলাদা একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকি। রান্নাবান্না, আর সব কিছুই নিজেরটা নিজে করে নিই। দাড়িও কামাই না সেই কদিন।
সে রকমই একবার গিয়েছিলুম এক জায়গায়, নাম বলছি না, ধরা যাক সে জায়গাটার নাম দুরানিগঞ্জ, মহারাষ্ট্রের মধ্যেই, নদীর ধারে ছোট শহর, চারপাশে ছোট-ছোট পাহাড়ঘেরা। শহর থেকে অনেকটা বাইরে, একটা পাহাড়ের গায়ে অনেকগুলো কটেজ বানিয়ে রাখা আছে, ভাড়া দেওয়ার জন্য। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে আমি বুক করেছিলাম সেরকম একটা কটেজ।
দুরানিগঞ্জের একমাত্র সিনেমা হলে তখন যে ছবিটা চলছে, সেটা আমরাই সুর দেওয়া। সুরকারদের ছবি তো পোস্টারে থাকে না, তাই আমাকে দেখে কেউ চিনবে না। শহরে আমি যেতামই না, একসঙ্গে অনেক খাবারদাবার কিনে এনে বাড়িতে বসে থাকতাম চুপচাপ।
পরিবেশটা ভারী সুন্দর। আমার কটেজটা পাহাড়ের মাঝামাঝি জায়গায়, বারান্দায় দাঁড়ালেই অনেক নীচে দেখা যায় নদীটাকে। প্রচুর গাছপালা। অনেক পাখি এসে বসে। কোনটা কোন পাখি তা চিনি না। এক-একটা পাখি দেখে মনে হয়, এরকম পাখি আগে কখনও দেখিনি। আমি শহরের মানুষ, পাখি আর দেখলাম কবে?
প্রথম দু-তিনদিন কানের মধ্যে যেন ঝনঝন শব্দ হত। মুম্বইয়ের জীবন, পার্টি, পঁয়ষট্টিটা ইনস্ট্রমেন্ট নিয়ে মিউজিক, রেকর্ডিং, অনবরত গাড়ির আওয়াজ এসবের রেশ হয়ে গিয়েছিল। আস্তে-আস্তে সেগুলো কমে গেল, উপভোগ করতে লাগলুম নির্জনতার ঝঙ্কার।
এরকমভাবে চাঁদও তো দেখিনি কতদিন। পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে আস্ত একখানা চাঁদ, দুধের মতন তার জ্যোৎস্না। এক-একসময় আবার মনে হত, একটা সাদা সিল্কের চাদরের মতন জ্যোৎস্না দুলছে। আমি কবিটবিনই, অন্যের লেখা কবিতায় সুর দিয়ে গান গাই। তবে মনে এমন-এমন সব ভাবনা আসত যে নিজেই অবাক হয়ে যেতুম। ধোঁওয়া নেই, ধুলো নেই, পরিষ্কার ঝকঝকে আকাশ। সত্যি কথা বলছি, সেই আকাশের তলায় বসে থাকতে আমার মদ খাওয়ার। ইচ্ছেটাই যেন চলে গিয়েছিল। অভ্যেসবশত একটু-একটু খেতাম ঠিকই, আবার ভরতি গেলাস পড়েই থাকত, ছুঁতাম না।
এরকম চমৎকার জায়গায় একটাই শুধু অসুবিধে ছিল।
আমাদের দেশের অনেক পাহাড়ের চূড়াতেই একটা করে মন্দির থাকে। এ-পাহাড়টাতেও ছিল, ঠিক মন্দির নয়, একটা আখড়া। বিশেষ এক ধরনের বৈষ্ণব কাল্টের আখড়া, সর্বেশানন্দ নামে এক সাধু এর প্রতিষ্ঠাতা, তিনি বেঁচে নেই, তাঁর প্রধান শিষ্য প্রেমঘনানন্দ এই সম্প্রদায়ের গুরু, তাঁর বয়েস পঁচাশি। তিনি থাকেন ওই পাহাড়চূড়ায়।
আশ্রম বা আখড়া থাকে থাক, তাতে আমার কী! প্রত্যেকদিন সন্ধেবেলা ওখানে খোল-করতাল বাজিয়ে প্রায় ঘণ্টাদেড়েক ধরে কীর্তন বা প্রার্থনা-ট্রার্থনা হয়, অনেক লোক একসঙ্গে গান গায়। সেই আওয়াজ আমার বাড়ি পর্যন্ত আসে। সেই গানে আমার শান্তি ভঙ্গ হয়। বিরক্ত লাগে। সুরেলা গান হলেও তবু কথা ছিল, কিন্তু তা তো নয়, মাঝে-মাঝেই বেসুরো হয়ে যায়। আফটার অল আমি
তো গানবাজনার লাইনের লোক, বেসুরো গান একেবারে সহ্য করতে পারি না।
কিন্তু কী আর করা যাবে! কারও বাড়িতে খুব বেশি চেঁচামেচি হলে অন্য কেউ নালিশ জানাতে।
পারে। কিন্তু ধর্মস্থানে যতই হল্লা হোক, কোনও আপত্তি করা চলবে না। সন্ধের সময় ওই। দেড়ঘণ্টা আমি দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতাম।
একদিন বিপদ যেন পায়ে হেঁটে উপস্থিত হল আমার কাছে। সে বিপদ এর নারীর বেশে।
আমার বাড়ির পাশ দিয়ে পাহাড়ের চূড়া থেকে নীচে নামবার পায়ে-হাঁটা রাস্তা, এ-আখড়ার লোকজনদের সেই রাস্তা দিয়ে ওঠা-নামা করতে দেখি। কারও সঙ্গে ডেকে কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না।
তখন বেলা এগারোটা, আমি দাঁড়িয়ে আছি বারান্দায়। নীচে নদীটায় স্নান করতে যাব কি না ভাবছি। দুটি মেয়ে পাকদণ্ডী ছেড়ে আমার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। একজন গেরুয়া পরা, একজন সাদা শাড়ি, বোঝা গেল, ওই আখড়ার।
প্রথমে কয়েক মিনিট মনে হল, তারা আমার বাড়িটাই দেখছে। যদিও এমন কিছু দর্শনীয় নয়, ওখানকার সব বাড়িই এক রকম। কিছু বাড়ি ফাঁকাও পড়ে আছে।
আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে একজন বলল, আমরা একটু ভেতরে আসতে পারি?
এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখা দরকার। আমি বেশি বেশি নারী-চৰ্চা করি। এরকম একটা সুনাম বা দুর্নাম আমার আছে। কিন্তু আমি যখন এই ধরনের অজ্ঞাতবাসে যাই, তখন নারীসঙ্গের কোনও অভাব বোধ আমার থাকে না। ইচ্ছে করলেই তো আমি মুম্বই থেকে যে-কোনও একটা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারি। কিন্তু এই ধরনের লালসা পেছন ফেলে রেখে আসি আমি। একাকিত্বের অনুভবটাই আমাকে সবচেয়ে আনন্দ দেয়।
মেয়ে দুটিকে কোনও উত্তর না দিয়ে আমি ভেতরে চলে গেলেই ল্যাঠা চুকে যেত। ওরা আর ঢুকত না ভেতরে। অভদ্রতার মতন দেখালেও সেটাই আমার চরিত্রে মানায়। কিন্তু কোনও কারণে আমার মনটা তখন নরম ছিল। মনে হল, ওরা নিশ্চয়ই চাঁদা চাইতে এসেছে। কিছু দিয়ে দিলেই তো হয়।
বললুম, আসুন!
বাড়িটা দোতলা। বসবার ঘর একতলায়, খুব কাছেই সে পায়ে-চলা রাস্তা। দরকার হয়নি বলে, এ-ঘরটা আগে ব্যবহার করিনি। যদিও সোফাটোফা দিয়ে সাজানো আছে।
খুলে দিলাম সবকটা জানলা। মেয়ে দুটি চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। যে গেরুয়া শাড়ি পরা, তার বয়েস বছর তিরিশেক হবে। অন্যজন একটু ছোট মনে হয়।
আমি বললুম, ভেতরে এসে বসুন। ওরা তবু দাঁড়িয়েই রইল। গেরুয়া পরা মেয়েটি বলল, কাল পূর্ণিমা, আমাদের আশ্রমে একটা উৎসব আছে। আপনাকে আমন্ত্রণ জানাতে এসেছি। আপনি একবার চরণধূলি দিলে আমরা ধন্য হব। গুরুদেব বলে দিয়েছেন, আপনি অনুগ্রহ করে ওখানেই প্রসাদ গ্রহণ করবেন।
বৈষ্ণব বিনয়! চাঁদা চাইতে আসেনি, বরং নেমন্তন্ন করে খাওয়াতে চায়। দু-চারজন শাঁসালো ভক্ত টাকা জোগায় বোধহয়।
আমি জিগ্যেস করলুম, আপনাদের ওখানে কীসের উৎসব?
সাদা-শাড়ি চঞ্চল চোখে নীরব, গেরুয়া মেয়েটি কথা বলছে। সে দু-হাত কপালে ঠেকিয়ে চক্ষু বুজে প্রণাম করে বলল, পরমগুরু সর্বেশানন্দজির কাল আবির্ভাব দিবস। দয়া করে আসবেন। বেশিক্ষণ লাগে না ওপরে উঠতে, বড়জোর দশমিনিট। নামগান হবে, শুনেই চলে আসবেন।
জন্মদিনকে এরা বলে আবির্ভাব দিবস!
আমি ঠোঁট কাটা মানুষ, ফস করে বলে ফেললুম, নামগান হবে? কিছু মনে করবেন না। রোজ সন্ধেবেলা আপনাদের ওখানে কীর্তন-টির্তন হয়, এখান থেকেও শুনতে পাই। মাঝে-মাঝে বড় বেসুরো শোনায়!
মেয়েটির ওষ্ঠে এবার একটা পাতলা হাসির রেখা ফুটেই মিলিয়ে গেল। সে বলল, বেসুরো হয় বুঝি? তা হলে আপনিই সুর শিখিয়ে দিন না। একটু হকচকিয়ে গিয়ে বললুম, আমি শেখাব? তার মানে আমি কে, তা কি আপনি জানেন?
মেয়েটি আবার একটু হাসি দিয়ে বলল, এখানে অনেকেই জেনে গেছে, আপনি গায়ক অভিজিৎ সেন।
কী করে যে খবর ছড়ায়! এখানে এসে কারও সঙ্গে কোনও কথা হয়নি, দেখা হয়নি, তবু…। যে কেয়ারটেকারটি প্রথম দিন চাবি এনে দরজা খুলে দিয়েছে, সে-ই বোধহয় নামটা বলে দিয়েছে অন্যদের।
এই গেরুয়া-নারী কি বাঙালি?
অবশ্যই। প্রথম থেকেই সে বাংলায় কথা বলছে আমার সঙ্গে। হয়তো মহারাষ্ট্রে জন্ম, কিন্তু বাংলা উচ্চারণ পরিষ্কার। কণ্ঠস্বর বেশ নরম, তার সঙ্গে বৈষ্ণব-বিনয় মিশে মধুর হয়েছে।
এরকম একটা অখ্যাত জায়গার আশ্রমে একটি বাঙালি তরুণী মেয়ে এল কী করে? কৌতূহল হবেই।
অন্য মেয়েটি বাঙালি নয়। সে এবার মারাঠি ভাষায় বলল, তাই, চল। এরপর ঘিয়ের দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।
গেরুয়া মেয়েটি তাকে মারাঠি ভাষায় উত্তর দিল দাঁড়া, ইনি এখনও কথা দেননি!
আমি বললুম, আপনারা দাঁড়িয়ে কেন, বসুন না।
গেরুয়া মেয়েটি একটি সোফায় বসল। অন্য মেয়েটির অস্থির ভাব।
আমি জিগ্যেস করলুম, আপনাদের এই আশ্রমটি কত দিনের?
সে বলল, সত্তর বছর। তখন এখানে আর কোনও বাড়ি-ঘর ছিল না।
—আপনি কতদিন ধরে আছেন?
–সাড়ে চার বছর।
—এর মধ্যেই আপনাকে গেরুয়া দিয়েছে? আমি যতদূর জানি, এত তাড়াতাড়ি তো গেরুয়া দেওয়া হয় না।
—আমাদের এখানে অন্য নিয়ম।
অন্য মেয়েটি এবার বলল, ভাই, তুমি কথা বলো, আমি ততক্ষণে দৌড়ে ঘি কিনে আনি? না পেলে মুশকিল হবে। ফেরার সময় তোমাকে এখান থেকে ডেকে নেব?
গেরুয়া মেয়েটি বলল, না, চল, আমিও যাই তোর সঙ্গে।
তার পরই মত বদলে ফেলে বলল, আমি কি এখানে একটু বসতে পারি? আপনার অসুবিধে হবে? অনেকদিন বাংলা কথা বলিনি। এতদূরে তো বাঙালি বড় একটা আসে না।
—বসুন না। কোনও অসুবিধে নেই।
বোঝা গেল, সন্ন্যাসিনী হলেও মাতৃভাষার ওপর টান থাকে। বোঝা গেল, সন্ন্যাসিনী হলেও বিখ্যাত লোকদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার বাসনা থাকে।
আমি এবার আরাম করে পা ছড়িয়ে বসে একটা সিগারেট ধরালুম। মেয়েটি তেমন কিছু সুন্দরী নয়, কিন্তু সুশ্রী বলা যায়। ফিলম দুনিয়ায় অনেক ডাকসাইটে সুন্দরীদের সঙ্গে মেলামেশা। করেছি। তারা সবসময় লিপস্টিক মেখে থাকে, ভুরু কামিয়ে আঁকে, আরও নানারকম প্রসাধন করে। শুধু ফিলমের মেয়ে কেন, সমাজের মাঝারি স্তরের মেয়েরাও এরকমভাবে আছে। ভুরু আঁকা, লিপস্টিক ছাড়া মেয়েদের অনেক বছর দেখিইনি বলা যায়। সেই তুলনায় এ যেন একটি মাটির মেয়ে। গায়ের রং মাজা-মাজা, কপালে আর নাকে চন্দনের রেখা, মুখের চামড়াও চোখের দৃষ্টিতে একটুও উগ্রতা নেই। বরং যেন একটা স্নিগ্ধতার আলো রয়েছে।
তিন-চারদিন আমি কারও সঙ্গে কথা বলিনি। কেয়ারটেকারটি দিনে একবার এসে আমার খোঁজ নিয়ে যায়। তাঁর সঙ্গে হু-হা বললেই কাজ চলে যায়, কথা বলার প্রয়োজন হয় না।
লেখাপড়া শিখলে মানুষের মুখে একটা ছাপ পড়ে, এ-মেয়েটির মুখে সেই ছাপ আছে।
জিগ্যেস করলুম, আপনার নাম কী?
সে বলল, অনসূয়া। আমাকে সবাই অনু বলে ডাকে।
পদবি বলল না। বিবাহিতা কি না বোঝবার উপায় নেই। বৈষ্ণবীদের কণ্ঠী বদল করে বিয়ে হতে পারে কারও সঙ্গে, কিন্তু তার বোধহয় বাইরের কোনও চিহ্ন থাকে না।
আবার জিগ্যেস করলুম, আপনার এত কম বয়েস। এই জায়গাটার কথাও বেশি লোক জানে না, আপনি এখানে যোগ দিলেন কী করে?
অনুসূয়া মুখ নীচু করে বলল, মন টেনেছিল। আমাদের আর-একটি আশ্রম আছে কোলাপুরে, সেখানে একদিন গুরুজির ভাষণ শুনেছিলাম। তখনই মনে হয়েছিল, এটাই আমার পথ।
—আপনার বাড়ির লোক বাধা দেয়নি? বাবা-মা আছেন নিশ্চয়ই?
—পূর্বাশ্রমের কথা আমাদের বলতে নেই।
—আপনি সিনেমা দেখেন?
—না।
—লোকের মুখে শুনেছেন, আমি একজন গায়ক? নাকি, আপনি নিজে কখনও আমার গান শুনেছেন?
—এখানে আসবার আগে শুনেছি।
—দেখুন, হয়তো আমার বেশি কৌতূহল দেখানো হয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে না করলে উত্তর দেবেন না। আপনার বয়েসি একটি মেয়ে, এখানে সারাজীবন থেকে যাবেন? কী পাবেন? কীসের আশায়…
—কিছু তো পেতে চাই না। এখানে আমি স্বামী-সেবা করি।
—স্বামী? ঠিক বুঝলাম না। আপনি বিবাহিতা?
—হ্যাঁ।
—স্বামী সেবার জন্য আশ্রমে থাকতে হবে কেন?
—আমার স্বামী বংশীধারী,ব্রজবিহারী প্রভু শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর বিগ্রহের সঙ্গে মালা বদল করে আমার বিবাহ হয়েছে। আমাদের আশ্রমে যে-কজন মেয়ে আছে, সকলের জন্যই এই নিয়ম।
—মীরাবাই? মীরাবাইয়ের তবু একজন জলজ্যান্ত স্বামী ছিল, শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদিনী ছিল, সংসার ছিল। সেই সংসারজীবন অসহ্য বোধ হওয়ায় মীরাবাই কৃষ্ণের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। আপনার কি সেরকম কোনও অভিজ্ঞতা আছে?
—আমাদের এ সম্পর্ক জন্ম-জন্মান্তরের।
—তার মানে কি দেবদাসী?
—দাসী নই, আমি প্রভুর জীবনসঙ্গিনী।
একবার ইচ্ছে হল বাঁকা ভাবে জিগ্যেস করি, ওই প্রভুটি কে? শ্রীকৃষ্ণের বকলমে গুরুজিটি নাকি? অনেক সাধুরই এরকম লীলাসঙ্গিনী থাকে।
তার পরই মনে হল, প্রথম দিন কেয়ারটেকারটি এ-জায়গাটা সম্পর্কে হড়বড় করে অনেক কিছু শুনিয়েছিল। তখনই জেনেছি, পাহাড়ের ওপরের আখড়ায় গুরুজিটির বয়েস পঁচাশি। তবে আরও কমবয়েসি কয়েকজন চ্যালাট্যালাও থাকতে পারে। কিন্তু অনসূয়ার মুখের সারল্য দেখে ওই ধরনের কোনও সম্পর্কের কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করল না।
খানিকটা সহানুভূতির সঙ্গেই বললুম, আপনার কথা শুনেই বোঝা যায়, আপনি কিছুটা লেখাপড়া শিখেছেন। আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন, একটা পাথরের বিগ্রহ কোনও জীবন্ত রমণীর স্বামী হতে পারে?
—প্রভু তো শুধু পাথরের বিগ্রহ নন। তিনি জীবন্ত।
—জীবন্ত? যে কথা বলে না, সাড়া দেয় না, যার চোখের পলকও পড়ে না, সে জীবন্ত হয় কী করে?
—আমার প্রভু আমার সঙ্গে কথা বলেন।
–কথা বলেন? দেখুন, আমি এটা জানতে চাই, সত্যিই কি তা সম্ভব? পাথরের মূর্তি…
প্রভু আমার সঙ্গে কথা বলেন স্বপ্নে। প্রত্যেক দিন। তিনি হাসেন, গল্প করেন…
এবার আমার হাসি পেয়ে গেল। বায়ুরোগ না থাকলে এরকম স্বপ্ন কেউ দেখে না। আর প্রত্যেকদিন একই স্বপ্ন দেখা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। অন্ধ বিশ্বাস ছাড়া এটা আর কিছুই নয়।
কেষ্টঠাকুরটিরও তো আদ কম নয়। দ্বাপর যুগে যে তিনটি বউ, শ্রীরাধার মতন পরকীয়া এবং আরও ষোলো হাজার গোপিনীর সঙ্গে লীলাখেলা করে গেছে। কলি যুগেও তার এমন দাপট? তার এমনই সেক্স অ্যাপিল যে অনসূয়ার মতন একটি সরল কমনীয় মেয়ে এই আশ্রমেরই আরও কয়েকটি মেয়ের সঙ্গে স্বামী হিসেবে তাকে ভাগ করে নিতেও রাজি?
এর পরেই আমি যে কাণ্ডটি করলুম, যার আপাত কোনও যুক্তি নেই। এটা আমার স্বভাবের সেই দিক, যা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
অনসূয়া বসেছিল দরজার ঠিক কাছের সোফায়। আমি খানিকটা দূরে। হঠাৎ আমি বাঘের মতন এক লাফ দিয়ে উঠে গিয়ে অনসূয়ার পিঠে একটা হাত জড়িয়ে, অন্য হাতে তার থুতনিটা উঁচু। করে চুমু খেলুম। নিছক এক ঠোক্করের চুমু নয়, গভীর, গাঢ় চুমু। প্রথমে সে ঠোঁট খুলতে চায়নি, খানিকটা জোর করেই ঠোঁট ফাঁক করতে হল।
চুমু শেষ করে আমি দ্রুত ফিরে গেলুম নিজের জায়গায়।
ব্যাপারটা এমনই আকস্মিক এবং অচিন্ত্যনীয় যে অনুসূয়া আমাকে ঠিক মতন বাধা দিতেও পারেনি। তা ছাড়া আমার সঙ্গে গায়ের জোরে পারবে কেন? আমি ছেড়ে দিতেই সে প্রথমেই এস্তে জানলার দিকে তাকাল। এটা মেয়েদের সাধারণ ইনস্টিংক্ট। জানলার পাশেই রাস্তা, মাঝে-মাঝে। লোক চলাচল করে, কেউ-না-কেউ না দেখে ফেলতে পারত, দরজাও খোলা, ওর সঙ্গিনীও ফিরে আসতে পারে যে-কোনও মুহূর্তে।
আমার কৈশোর বয়েসে মাসতুতো বোনকে ছাদের সিঁড়িতে জোর করে জাপটে ধরে চুমু খেয়েছিলাম। সে মুখে না-না, এ কী-এ কী বললেও সেটাকে খুব একটা জোর জবরদস্তি বলা যায়।, তার ব্যবহারে যথেষ্ট ইঙ্গিত ছিল। এ ছাড়া আমার বাকি জীবনে আমি কখনও কোনও মেয়ের ওপর জোর করিনি। কবিতা বনিতা চৈব সুখদা স্বয়মাগতা। কবিতা যেমন জোর করে লেখানো যায় না, সেরকম কোনও বনিতাও স্বয়মাগতা হলেই সুখপ্রদা হয়। সহবাস সম্মতি আইনে আমি একেবারে নির্দোষ।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে, অনসূয়ার প্রতি আমার এ ব্যবহার প্রায় বলাক্তারের পর্যায়েই পড়ে। আমি আগের মুহূর্তেও তাকে সিডিউস করার চেষ্টা করিনি। আমি যে পুরোপুরি দোষী, তা আমি স্বীকার করতে বাধ্য।
অনসূয়ার চোখ দিয়ে দরদর করে জল বেরিয়ে আসতে লাগল। নিদারুণ আহত গলায় বলল, এ আপনি কী করলেন? এ আপনি কী করলেন?
সে থরথর করে কাঁপছে। তাকে দেখে আমার মায়া হল, খানিকটা অনুতাপও হয়েছিল কি? না, তা বোধহয় হয়নি। অনুতাপ করলে তো কবেই আমি শুদ্ধ সাত্বিক লোক হয়ে যেতুম।
আমি আবেগহীন গলায় বললুম, তোমাকে হঠাৎ আমার আদর করতে ইচ্ছে হল। হয়তো এটা অন্যায়। অনেকেই তাই মনে করবে। আমি এরকমই।
দুদিকে মাথা নেড়ে সে বলল, না, না, ছি-ছি। কী করলেন? আপনার যদি বিপদ হয়?
আমি বললুম, তুমি চেঁচিয়ে তোক ডাকতে পার। সবকথা বলে দিতে পারো। তোমার কথা সবাই বিশ্বাস করবে।
সে আরও জোরে-জোরে মাথা নাড়তে লাগল আর ফোঁপাতে লাগল।
আমি বললুম, লোকজন এসে যদি শাস্তি দেয়, তা আমি মাথা পেতে নিতে রাজি আছি।
অনসূয়া বলল, আপনার জন্য আমি প্রার্থনা করব।
আমি বুঝতে না পেরে জিগ্যেস করলুম, আমার জন্য প্রার্থনা করবে? কেন? কী প্রার্থনা করবে? আমি যাতে আজ রাত্তিরেই মরে যাই? যাতে কেউ কিছু জানতে না পারে?
অনসূয়ার সারা শরীরটাও আরও জোরে কেঁপে উঠল। সে বলল, না, না, প্রভু যদি রাগ করেন, আপনাকে শাস্তি দিতে চান, আমি ক্ষমা চাইব।
–প্রভু? মানে পাথরের বিগ্রহ?
আবার আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। একটা পাথরের মূর্তি আমার ওপর প্রতিশোধ নেবে? এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? দেখি তো তার কত ক্ষমতা! চ্যালেঞ্জ রইল।
পাপ যদি করে থাকি, তাহলে আর-একটু বেশিই করা যাক।
একইভাবে লাফিয়ে গিয়ে ফের জড়িয়ে ধরলুম অনসূয়াকে। পাগলের মতো আদর করতে-করতে বলতে লাগলুম, এত সুন্দর একটা মেয়ে, সে সারাজীবন শুধু একটা পাথরের সঙ্গে…সে আমার কিছু করতে পারবে না।
অনসূয়া ছটফট করলেও নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারেনি। এবারে শুধু চুমু নয়, আরও আদর দিলুম তার বুকে। তার নীচে আর নামিনি। একটু পরে ফিরে এলুম নিজের জায়গায়।
দরজা-জানলা সব ভোলা। কোনও লোক দেখা যায়নি অবশ্য। অনসূয়া কোনও কথা বলছে না। মুখ ঢেকে কেঁদেই চলেছে।
এবারে আমার অপরাধবোধ অনেক কম। অনসূয়া বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে ঠিকই। কিন্তু তার শরীর যে উষ্ণ হয়ে উঠছিল তাও আমি টের পেয়েছি। শুধু উষ্ণতা নয়, তার বুকে যেন আগুনের হলকা। সাধারণ জৈবিক নিয়মেই তার শরীর সাড়া দিয়েছে। কোনও পাথর কি এই উষ্ণতা জাগাতে পারবে?
বাগানের লোহার গেটে ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হল। অন্য মেয়েটি ফিরে আসছে। অনসূয়াও শুনতে পেয়েছে। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। চোখ-মুখ মুছে নিল ভালো করে। অন্য মেয়েটি বাগান পেরুবার আগেই অনসূয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়ে একবার আমার দিকে সরাসরি চাইল। চক্ষু দুটি লাল, কান্নার ফলে মুখখানি ভাসাভাসা, ঠোঁট ফোলা। ধরা গলায় বলল, আপনার জন্য আমি প্রার্থনা করব প্রত্যেকদিন।
বলাই বাহুল্য, এরপর পাহাড় চূড়ায় সেই আখড়ার উৎসবে আমি যাইনি। ওখানে থেকে আর কেউ আসেনি আমার কাছে। অনসূয়াকে ওই রাস্তা দিয়ে যেতেই দেখিনি। দিনতিনেক পরে ফিরে এলুম কাজের জায়গায়।
শুধু কাজ তো নয়, আবার পার্টি, হইহল্লা, রাত্রি জাগরণ। প্রত্যেকটি দিনই উত্তেজনা ও অস্থিরতাময়। এর মধ্যে ওই নির্জন প্রবাসের স্মৃতি আস্তে-আস্তে ফিকে হয়ে আসে। মাঝে-মাঝে এক-এক ঝলক চোখে পড়ে, তারপর হারিয়ে যায়।
হারিয়ে গেল না অন্য একটি কারণে।
মুম্বই ফেরার ঠিক সাড়ে চার মাস পর আমার জন্ডিস হল। এমনই গুরুতর ধরনের যে ভরতি হতে হল নার্সিংহোমে।
আমাদের হাঁচি-কাশি হলেও কাগজে খবর বেরোয়। রেডিওতে বলে। অনেক ভক্তর চিঠি আসে। দেখতেও আসে অনেকে। আমার একজন সেক্রেটারি আছে বটে, চিঠি সব আমি নিজেই পড়ি। নার্সিংহোমে শুয়ে-শুয়েই অন্য অনেক চিঠির মধ্যে একখানা চিঠি দেখে চমকে উঠতে হল।
নাম সই নেই। গোটা-গোটা বাংলা অক্ষরে লেখা: আমি তিনদিন উপবাসে থেকে আপনার জন্য প্রার্থনা করছি। আপনি ভালো হয়ে উঠবেন। আপনি ক্ষমা পাবেন।
এ-চিঠি নিশ্চিত অনসূয়ার। যাচ্চলে! ওর ধারণা, ওর ভগবান রাগ করে আমাকে এই জন্ডিস রোগের শাস্তি দিয়েছে!
ভগবানগুলো খুব হিংসুটে হয় বটে। ওল্ড টেস্টামেন্টের ঈশ্বর তো নিজের মুখেই বলেছেন, আই অ্যাম অ জেলাস গড। গীতায় শ্রীকৃষ্ণও বলেছেন, মামেকং শরণং ব্রজ। একমাত্র আমাকেই শরণ করো। অন্যান্য ধর্মেরও ঈশ্বর বা অবতাররা বলেছেন, শুধু আমাকেই আশ্রয় করো, অন্য কোনও দিকে তাকাবে না! আরে বাপু, ভগবান হিসেবে যদি তোমার অতই গুণপনা ও আকর্ষণ থাকে, তা তোমাকে নিজের মুখে বলতে হবে কেন?
মুম্বইতে সেবার জন্ডিস প্রায় এপিডেমিকের আকার নিয়েছিল। আমার ওই নার্সিংহোমে প্রায় সব বেডেই জন্ডিসের রোগী। পটাপট করে কয়েকজন মরেও গেছে। তাহলে কি একা আমার অপরাধে অতগুলো লোককে ভগবান শাস্তি দিয়েছে? কিংবা ওই সবকটা লোকই ভগবানের বউদের ধরে টানাটানি করেছে?
একমাত্র এই অপরাধ ছাড়া আর তো কোনও ব্যাপারে ভগবানের রাগারাগির চিহ্ন দেখি না। চতুর্দিকে জাল-জোচ্চুরি, কালোবাজার, নারীহরণ, নারী ধর্ষণ, নারী কেনা-বেচা, মাফিয়ারা থাকছে বুক ফুলিয়ে, রাজনৈতিক নেতাগুলো বদের ধাড়ি, দুকান কাটা, চুরি করছে কোটি-কোটি টাকা, কারুর কোনও শাস্তি হয়?
আমার পাশের বেডে রোগীটির বয়েস তেরো বছর, তার অবস্থা আমার চেয়েও সাংঘাতিক। সে কি অপরাধ বা পাপ করতে পারে?
অনুসূয়া বৈষ্ণব, ক্ষমাই তার ধর্ম। আমার ওই গা-জুয়ারি অপরাধ সে ক্ষমা করে দিয়েছে। কিন্তু তার যে আরাধ্য দেবতা, সে রাগে বা হিংসেয় আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে, এই তার বিশ্বাস।
নাসিংহোম থেকে ছাড়া পেয়ে আরও কিছুদিন আমায় শয্যাশায়ী থাকতে হয়। জন্ডিসের পর নিয়ম-কানুন মানতে হয় অনেক, ভাজাভুজি খাওয়া বারণ, মদ একেবারে নিষিদ্ধ। এ-রোগের ওষুধ বিশেষ নেই, সংযম আর বিশ্রামই আসল। মুম্বইয়ের দিকে যেসব মাছ পাওয়া যায়, সেগুলো ঝোলের বদলে ভাজা খেতেই ভালো লাগে। মাছ ছাড়া আমি ভাত খেতে পারি না। মাঝে-মাঝে মাছ ভাজা খেয়েছি, মদও দু-এক ঢোক খেয়েছি লুকিয়ে। তবু সেরে তো উঠলুম!
আবার গান রেকর্ডিং শুরু করার পর অনসূয়ার কাছ থেকে আর-একটা চিঠি এল। এবারও অস্বাক্ষরিত। আপনি সুস্থ হয়ে ওঠায় আমরা সবাই পুলকিত। আপনার নামে পূজা দিয়েছি। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।
আমি নয়, আমরা? এটাই বৈষ্ণবদেবের ভাষা!
তাহলে আমার অসুখ সারল অনসূয়ার পূজা ও প্রার্থনার জন্য, না আমার মনের জোরে?
এর পরের বছরও আমার নির্জন বাসের দরকার হয়েছিল। দুরানিগঞ্জ যাইনি, গিয়েছিলুম। মধ্যপ্রদেশের বস্তারে। সেখান থেকে ফেরার পর একদিন স্টুডিয়োতে একটি নতুন মেয়ের গান রেকর্ডিং করাবার সময় আমার রক্তবমি হল। বেশ অনেকখানি। প্রথমে ধারণা হয়েছিল, জন্ডিস ভালো করে সারেনি বলেই এই বিপত্তি। ডাক্তাররা জোর করে নার্সিংহোম শুইয়ে দিল। পরে ধরা পড়ল আলসার।
আমার খাওয়া-দাওয়ার কোনও ঠিক নেই, এক-একদিন সারাদিন কিছু খাওয়ার সময়ই পাই না, তারপর সন্ধের সময় প্রচুর ভাজাভুজি, চানাচুর, প্রচুর মদ্যপান, এত সিগারেট, ঘুম কম, আমার আলসার হবে না তো কার হবে?
এর মধ্যেই অনসূয়ার আর-একটা চিঠি চলে এল। ওই একই রকম বয়ান। সে আমার জন্য প্রার্থনা করছে। এই আলসারও ভগবানের রাগের প্রকাশ? এবারে মেরেই ফেলবে নাকি?
এমন কড়া জান, অত সহজে কি যায়? অপারেশন না করিয়েই সেরে উঠলুম। একেবারে ফিট। আবার অনসূয়ার চিঠি। যেন তার প্রার্থনাতেই আমি সেরে উঠেছি!
কি করে ও খবর পায়, কে জানে! মুম্বইয়ের বাঙালিদের মধ্যে-মধ্যে আভাসে-ইঙ্গিতে খোঁজ খবর নিয়েছি, তাদের পরিবারের কোনও মেয়ে বৈষ্ণবী হয়ে আখড়ায় যোগ দিয়েছে কি না। মুম্বইতে এত বাঙালি, কজনেই বা চিনি। কোনও সন্ধান পাইনি। অনসূয়া একবার কোলাপুরের নাম। বলেছিল, হয়তো ও সেখানকারই মেয়ে। কিন্তু কোলাপুরে আর কে খোঁজ নিতে যায়? আমার অত সময়ই বা কোথায়?
মানুষের জীবনে মাঝে-মাঝে কিছু অসুখ-বিসুখ, কিছু দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে যেতেই হয়। বিশেষত আমাদের মতন যাদের বলগা ছাড়া জীবন, সবসময় অনিয়ম, আমাদের ঝুঁকি বেশি।
যখনই এরকম কিছু ঘটে, তখনই অনসূয়ার চিঠি আসে। সাধারণ জ্বর হলেও। যেন তার ভগবান কিছুতেই প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ভুলতে পারছে না। আরে বাবা, তোমার শ্রীকৃষ্ণ সুদর্শন চক্র পাঠিয়ে আমার গলাটা কুচুৎ করে কেটে দিলেই তো পারে। সে চক্ৰখানা কি হারিয়ে গেছে?
একবার একটা দুর্ঘটনা হল ইউরোপে। রাইন নদীর একটা ফেরি পার হচ্ছিলাম। অতি সুদৃশ্য স্টিমার, দু-পাশের দৃশ্যও চমৎকার। বেশ শীত, আমার গায়ে ওভারকোট, দাঁড়িয়েছিলুম বাইরে রেলিং ধরে। হঠাৎ একটা বার্জ এসে স্টিমারটার উলটো দিকে ধাক্কা মারল। খুব জোর ধাক্কা। সেই ইমপ্যাক্ট সামলাতে না পেরে আমি, আরও দুজন ছিটকে পড়ে গেলুম নদীতে।
আমি হইচই ভালোবাসি, আবার নির্জনতাও ভালোবাসি। মুম্বইয়ের জীবন সবসময় উদ্দাম, বিশেষত আমাদের লাইনে। সবসময় সবাই ছুটছে, থামবার উপায় নেই। রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত জাগা, মদ্যপান, মেয়েদের নিয়ে হুল্লোড়, এসব তো লেগেই আছে। আমি খুব পছন্দ করি এইসব, লোকে জানে, আমি এক নম্বর হুল্লোড়বাজ।
আবার এক-একসময় এইসবে দারুণ বিতৃষ্ণা জন্মে যায়। টানা দশ-পনেরো দিন চেনা কোনও লোকের সঙ্গে কথা বলতেই ইচ্ছে করে না। টেলিফোনের আওয়াজে গায়ে যেন হুল ফোটে। ফিলম লাইনের সবাই জানে, আমি মাঝে-মাঝে রহস্যময়ভাবে উধাও হয়ে যাই কয়েকদিনের জন্য। কোথায় যাই, কেউ টের পায় না।
সেসব সময়ে আমি কোনও হোটেলেও উঠি না। আলাদা একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকি। রান্নাবান্না, আর সব কিছুই নিজেরটা নিজে করে নিই। দাড়িও কামাই না সেই কদিন।
সে রকমই একবার গিয়েছিলুম এক জায়গায়, নাম বলছি না, ধরা যাক সে জায়গাটার নাম দুরানিগঞ্জ, মহারাষ্ট্রের মধ্যেই, নদীর ধারে ছোট শহর, চারপাশে ছোট-ছোট পাহাড়ঘেরা। শহর থেকে অনেকটা বাইরে, একটা পাহাড়ের গায়ে অনেকগুলো কটেজ বানিয়ে রাখা আছে, ভাড়া দেওয়ার জন্য। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে আমি বুক করেছিলাম সেরকম একটা কটেজ।
দুরানিগঞ্জের একমাত্র সিনেমা হলে তখন যে ছবিটা চলছে, সেটা আমরাই সুর দেওয়া। সুরকারদের ছবি তো পোস্টারে থাকে না, তাই আমাকে দেখে কেউ চিনবে না। শহরে আমি যেতামই না, একসঙ্গে অনেক খাবারদাবার কিনে এনে বাড়িতে বসে থাকতাম চুপচাপ।
পরিবেশটা ভারী সুন্দর। আমার কটেজটা পাহাড়ের মাঝামাঝি জায়গায়, বারান্দায় দাঁড়ালেই অনেক নীচে দেখা যায় নদীটাকে। প্রচুর গাছপালা। অনেক পাখি এসে বসে। কোনটা কোন পাখি তা চিনি না। এক-একটা পাখি দেখে মনে হয়, এরকম পাখি আগে কখনও দেখিনি। আমি শহরের মানুষ, পাখি আর দেখলাম কবে?
প্রথম দু-তিনদিন কানের মধ্যে যেন ঝনঝন শব্দ হত। মুম্বইয়ের জীবন, পার্টি, পঁয়ষট্টিটা ইনস্ট্রমেন্ট নিয়ে মিউজিক, রেকর্ডিং, অনবরত গাড়ির আওয়াজ এসবের রেশ হয়ে গিয়েছিল। আস্তে-আস্তে সেগুলো কমে গেল, উপভোগ করতে লাগলুম নির্জনতার ঝঙ্কার।
এরকমভাবে চাঁদও তো দেখিনি কতদিন। পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে আস্ত একখানা চাঁদ, দুধের মতন তার জ্যোৎস্না। এক-একসময় আবার মনে হত, একটা সাদা সিল্কের চাদরের মতন জ্যোৎস্না দুলছে। আমি কবিটবিনই, অন্যের লেখা কবিতায় সুর দিয়ে গান গাই। তবে মনে এমন-এমন সব ভাবনা আসত যে নিজেই অবাক হয়ে যেতুম। ধোঁওয়া নেই, ধুলো নেই, পরিষ্কার ঝকঝকে আকাশ। সত্যি কথা বলছি, সেই আকাশের তলায় বসে থাকতে আমার মদ খাওয়ার। ইচ্ছেটাই যেন চলে গিয়েছিল। অভ্যেসবশত একটু-একটু খেতাম ঠিকই, আবার ভরতি গেলাস পড়েই থাকত, ছুঁতাম না।
এরকম চমৎকার জায়গায় একটাই শুধু অসুবিধে ছিল।
আমাদের দেশের অনেক পাহাড়ের চূড়াতেই একটা করে মন্দির থাকে। এ-পাহাড়টাতেও ছিল, ঠিক মন্দির নয়, একটা আখড়া। বিশেষ এক ধরনের বৈষ্ণব কাল্টের আখড়া, সর্বেশানন্দ নামে এক সাধু এর প্রতিষ্ঠাতা, তিনি বেঁচে নেই, তাঁর প্রধান শিষ্য প্রেমঘনানন্দ এই সম্প্রদায়ের গুরু, তাঁর বয়েস পঁচাশি। তিনি থাকেন ওই পাহাড়চূড়ায়।
আশ্রম বা আখড়া থাকে থাক, তাতে আমার কী! প্রত্যেকদিন সন্ধেবেলা ওখানে খোল-করতাল বাজিয়ে প্রায় ঘণ্টাদেড়েক ধরে কীর্তন বা প্রার্থনা-ট্রার্থনা হয়, অনেক লোক একসঙ্গে গান গায়। সেই আওয়াজ আমার বাড়ি পর্যন্ত আসে। সেই গানে আমার শান্তি ভঙ্গ হয়। বিরক্ত লাগে। সুরেলা গান হলেও তবু কথা ছিল, কিন্তু তা তো নয়, মাঝে-মাঝেই বেসুরো হয়ে যায়। আফটার অল আমি
তো গানবাজনার লাইনের লোক, বেসুরো গান একেবারে সহ্য করতে পারি না।
কিন্তু কী আর করা যাবে! কারও বাড়িতে খুব বেশি চেঁচামেচি হলে অন্য কেউ নালিশ জানাতে।
পারে। কিন্তু ধর্মস্থানে যতই হল্লা হোক, কোনও আপত্তি করা চলবে না। সন্ধের সময় ওই। দেড়ঘণ্টা আমি দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতাম।
একদিন বিপদ যেন পায়ে হেঁটে উপস্থিত হল আমার কাছে। সে বিপদ এর নারীর বেশে।
আমার বাড়ির পাশ দিয়ে পাহাড়ের চূড়া থেকে নীচে নামবার পায়ে-হাঁটা রাস্তা, এ-আখড়ার লোকজনদের সেই রাস্তা দিয়ে ওঠা-নামা করতে দেখি। কারও সঙ্গে ডেকে কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না।
তখন বেলা এগারোটা, আমি দাঁড়িয়ে আছি বারান্দায়। নীচে নদীটায় স্নান করতে যাব কি না ভাবছি। দুটি মেয়ে পাকদণ্ডী ছেড়ে আমার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। একজন গেরুয়া পরা, একজন সাদা শাড়ি, বোঝা গেল, ওই আখড়ার।
প্রথমে কয়েক মিনিট মনে হল, তারা আমার বাড়িটাই দেখছে। যদিও এমন কিছু দর্শনীয় নয়, ওখানকার সব বাড়িই এক রকম। কিছু বাড়ি ফাঁকাও পড়ে আছে।
আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে একজন বলল, আমরা একটু ভেতরে আসতে পারি?
এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখা দরকার। আমি বেশি বেশি নারী-চৰ্চা করি। এরকম একটা সুনাম বা দুর্নাম আমার আছে। কিন্তু আমি যখন এই ধরনের অজ্ঞাতবাসে যাই, তখন নারীসঙ্গের কোনও অভাব বোধ আমার থাকে না। ইচ্ছে করলেই তো আমি মুম্বই থেকে যে-কোনও একটা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারি। কিন্তু এই ধরনের লালসা পেছন ফেলে রেখে আসি আমি। একাকিত্বের অনুভবটাই আমাকে সবচেয়ে আনন্দ দেয়।
মেয়ে দুটিকে কোনও উত্তর না দিয়ে আমি ভেতরে চলে গেলেই ল্যাঠা চুকে যেত। ওরা আর ঢুকত না ভেতরে। অভদ্রতার মতন দেখালেও সেটাই আমার চরিত্রে মানায়। কিন্তু কোনও কারণে আমার মনটা তখন নরম ছিল। মনে হল, ওরা নিশ্চয়ই চাঁদা চাইতে এসেছে। কিছু দিয়ে দিলেই তো হয়।
বললুম, আসুন!
বাড়িটা দোতলা। বসবার ঘর একতলায়, খুব কাছেই সে পায়ে-চলা রাস্তা। দরকার হয়নি বলে, এ-ঘরটা আগে ব্যবহার করিনি। যদিও সোফাটোফা দিয়ে সাজানো আছে।
খুলে দিলাম সবকটা জানলা। মেয়ে দুটি চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। যে গেরুয়া শাড়ি পরা, তার বয়েস বছর তিরিশেক হবে। অন্যজন একটু ছোট মনে হয়।
আমি বললুম, ভেতরে এসে বসুন। ওরা তবু দাঁড়িয়েই রইল। গেরুয়া পরা মেয়েটি বলল, কাল পূর্ণিমা, আমাদের আশ্রমে একটা উৎসব আছে। আপনাকে আমন্ত্রণ জানাতে এসেছি। আপনি একবার চরণধূলি দিলে আমরা ধন্য হব। গুরুদেব বলে দিয়েছেন, আপনি অনুগ্রহ করে ওখানেই প্রসাদ গ্রহণ করবেন।
বৈষ্ণব বিনয়! চাঁদা চাইতে আসেনি, বরং নেমন্তন্ন করে খাওয়াতে চায়। দু-চারজন শাঁসালো ভক্ত টাকা জোগায় বোধহয়।
আমি জিগ্যেস করলুম, আপনাদের ওখানে কীসের উৎসব?
সাদা-শাড়ি চঞ্চল চোখে নীরব, গেরুয়া মেয়েটি কথা বলছে। সে দু-হাত কপালে ঠেকিয়ে চক্ষু বুজে প্রণাম করে বলল, পরমগুরু সর্বেশানন্দজির কাল আবির্ভাব দিবস। দয়া করে আসবেন। বেশিক্ষণ লাগে না ওপরে উঠতে, বড়জোর দশমিনিট। নামগান হবে, শুনেই চলে আসবেন।
জন্মদিনকে এরা বলে আবির্ভাব দিবস!
আমি ঠোঁট কাটা মানুষ, ফস করে বলে ফেললুম, নামগান হবে? কিছু মনে করবেন না। রোজ সন্ধেবেলা আপনাদের ওখানে কীর্তন-টির্তন হয়, এখান থেকেও শুনতে পাই। মাঝে-মাঝে বড় বেসুরো শোনায়!
মেয়েটির ওষ্ঠে এবার একটা পাতলা হাসির রেখা ফুটেই মিলিয়ে গেল। সে বলল, বেসুরো হয় বুঝি? তা হলে আপনিই সুর শিখিয়ে দিন না। একটু হকচকিয়ে গিয়ে বললুম, আমি শেখাব? তার মানে আমি কে, তা কি আপনি জানেন?
মেয়েটি আবার একটু হাসি দিয়ে বলল, এখানে অনেকেই জেনে গেছে, আপনি গায়ক অভিজিৎ সেন।
কী করে যে খবর ছড়ায়! এখানে এসে কারও সঙ্গে কোনও কথা হয়নি, দেখা হয়নি, তবু…। যে কেয়ারটেকারটি প্রথম দিন চাবি এনে দরজা খুলে দিয়েছে, সে-ই বোধহয় নামটা বলে দিয়েছে অন্যদের।
এই গেরুয়া-নারী কি বাঙালি?
অবশ্যই। প্রথম থেকেই সে বাংলায় কথা বলছে আমার সঙ্গে। হয়তো মহারাষ্ট্রে জন্ম, কিন্তু বাংলা উচ্চারণ পরিষ্কার। কণ্ঠস্বর বেশ নরম, তার সঙ্গে বৈষ্ণব-বিনয় মিশে মধুর হয়েছে।
এরকম একটা অখ্যাত জায়গার আশ্রমে একটি বাঙালি তরুণী মেয়ে এল কী করে? কৌতূহল হবেই।
অন্য মেয়েটি বাঙালি নয়। সে এবার মারাঠি ভাষায় বলল, তাই, চল। এরপর ঘিয়ের দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।
গেরুয়া মেয়েটি তাকে মারাঠি ভাষায় উত্তর দিল দাঁড়া, ইনি এখনও কথা দেননি!
আমি বললুম, আপনারা দাঁড়িয়ে কেন, বসুন না।
গেরুয়া মেয়েটি একটি সোফায় বসল। অন্য মেয়েটির অস্থির ভাব।
আমি জিগ্যেস করলুম, আপনাদের এই আশ্রমটি কত দিনের?
সে বলল, সত্তর বছর। তখন এখানে আর কোনও বাড়ি-ঘর ছিল না।
—আপনি কতদিন ধরে আছেন?
–সাড়ে চার বছর।
—এর মধ্যেই আপনাকে গেরুয়া দিয়েছে? আমি যতদূর জানি, এত তাড়াতাড়ি তো গেরুয়া দেওয়া হয় না।
—আমাদের এখানে অন্য নিয়ম।
অন্য মেয়েটি এবার বলল, ভাই, তুমি কথা বলো, আমি ততক্ষণে দৌড়ে ঘি কিনে আনি? না পেলে মুশকিল হবে। ফেরার সময় তোমাকে এখান থেকে ডেকে নেব?
গেরুয়া মেয়েটি বলল, না, চল, আমিও যাই তোর সঙ্গে।
তার পরই মত বদলে ফেলে বলল, আমি কি এখানে একটু বসতে পারি? আপনার অসুবিধে হবে? অনেকদিন বাংলা কথা বলিনি। এতদূরে তো বাঙালি বড় একটা আসে না।
—বসুন না। কোনও অসুবিধে নেই।
বোঝা গেল, সন্ন্যাসিনী হলেও মাতৃভাষার ওপর টান থাকে। বোঝা গেল, সন্ন্যাসিনী হলেও বিখ্যাত লোকদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার বাসনা থাকে।
আমি এবার আরাম করে পা ছড়িয়ে বসে একটা সিগারেট ধরালুম। মেয়েটি তেমন কিছু সুন্দরী নয়, কিন্তু সুশ্রী বলা যায়। ফিলম দুনিয়ায় অনেক ডাকসাইটে সুন্দরীদের সঙ্গে মেলামেশা। করেছি। তারা সবসময় লিপস্টিক মেখে থাকে, ভুরু কামিয়ে আঁকে, আরও নানারকম প্রসাধন করে। শুধু ফিলমের মেয়ে কেন, সমাজের মাঝারি স্তরের মেয়েরাও এরকমভাবে আছে। ভুরু আঁকা, লিপস্টিক ছাড়া মেয়েদের অনেক বছর দেখিইনি বলা যায়। সেই তুলনায় এ যেন একটি মাটির মেয়ে। গায়ের রং মাজা-মাজা, কপালে আর নাকে চন্দনের রেখা, মুখের চামড়াও চোখের দৃষ্টিতে একটুও উগ্রতা নেই। বরং যেন একটা স্নিগ্ধতার আলো রয়েছে।
তিন-চারদিন আমি কারও সঙ্গে কথা বলিনি। কেয়ারটেকারটি দিনে একবার এসে আমার খোঁজ নিয়ে যায়। তাঁর সঙ্গে হু-হা বললেই কাজ চলে যায়, কথা বলার প্রয়োজন হয় না।
লেখাপড়া শিখলে মানুষের মুখে একটা ছাপ পড়ে, এ-মেয়েটির মুখে সেই ছাপ আছে।
জিগ্যেস করলুম, আপনার নাম কী?
সে বলল, অনসূয়া। আমাকে সবাই অনু বলে ডাকে।
পদবি বলল না। বিবাহিতা কি না বোঝবার উপায় নেই। বৈষ্ণবীদের কণ্ঠী বদল করে বিয়ে হতে পারে কারও সঙ্গে, কিন্তু তার বোধহয় বাইরের কোনও চিহ্ন থাকে না।
আবার জিগ্যেস করলুম, আপনার এত কম বয়েস। এই জায়গাটার কথাও বেশি লোক জানে না, আপনি এখানে যোগ দিলেন কী করে?
অনুসূয়া মুখ নীচু করে বলল, মন টেনেছিল। আমাদের আর-একটি আশ্রম আছে কোলাপুরে, সেখানে একদিন গুরুজির ভাষণ শুনেছিলাম। তখনই মনে হয়েছিল, এটাই আমার পথ।
—আপনার বাড়ির লোক বাধা দেয়নি? বাবা-মা আছেন নিশ্চয়ই?
—পূর্বাশ্রমের কথা আমাদের বলতে নেই।
—আপনি সিনেমা দেখেন?
—না।
—লোকের মুখে শুনেছেন, আমি একজন গায়ক? নাকি, আপনি নিজে কখনও আমার গান শুনেছেন?
—এখানে আসবার আগে শুনেছি।
—দেখুন, হয়তো আমার বেশি কৌতূহল দেখানো হয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে না করলে উত্তর দেবেন না। আপনার বয়েসি একটি মেয়ে, এখানে সারাজীবন থেকে যাবেন? কী পাবেন? কীসের আশায়…
—কিছু তো পেতে চাই না। এখানে আমি স্বামী-সেবা করি।
—স্বামী? ঠিক বুঝলাম না। আপনি বিবাহিতা?
—হ্যাঁ।
—স্বামী সেবার জন্য আশ্রমে থাকতে হবে কেন?
—আমার স্বামী বংশীধারী,ব্রজবিহারী প্রভু শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর বিগ্রহের সঙ্গে মালা বদল করে আমার বিবাহ হয়েছে। আমাদের আশ্রমে যে-কজন মেয়ে আছে, সকলের জন্যই এই নিয়ম।
—মীরাবাই? মীরাবাইয়ের তবু একজন জলজ্যান্ত স্বামী ছিল, শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদিনী ছিল, সংসার ছিল। সেই সংসারজীবন অসহ্য বোধ হওয়ায় মীরাবাই কৃষ্ণের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। আপনার কি সেরকম কোনও অভিজ্ঞতা আছে?
—আমাদের এ সম্পর্ক জন্ম-জন্মান্তরের।
—তার মানে কি দেবদাসী?
—দাসী নই, আমি প্রভুর জীবনসঙ্গিনী।
একবার ইচ্ছে হল বাঁকা ভাবে জিগ্যেস করি, ওই প্রভুটি কে? শ্রীকৃষ্ণের বকলমে গুরুজিটি নাকি? অনেক সাধুরই এরকম লীলাসঙ্গিনী থাকে।
তার পরই মনে হল, প্রথম দিন কেয়ারটেকারটি এ-জায়গাটা সম্পর্কে হড়বড় করে অনেক কিছু শুনিয়েছিল। তখনই জেনেছি, পাহাড়ের ওপরের আখড়ায় গুরুজিটির বয়েস পঁচাশি। তবে আরও কমবয়েসি কয়েকজন চ্যালাট্যালাও থাকতে পারে। কিন্তু অনসূয়ার মুখের সারল্য দেখে ওই ধরনের কোনও সম্পর্কের কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করল না।
খানিকটা সহানুভূতির সঙ্গেই বললুম, আপনার কথা শুনেই বোঝা যায়, আপনি কিছুটা লেখাপড়া শিখেছেন। আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন, একটা পাথরের বিগ্রহ কোনও জীবন্ত রমণীর স্বামী হতে পারে?
—প্রভু তো শুধু পাথরের বিগ্রহ নন। তিনি জীবন্ত।
—জীবন্ত? যে কথা বলে না, সাড়া দেয় না, যার চোখের পলকও পড়ে না, সে জীবন্ত হয় কী করে?
—আমার প্রভু আমার সঙ্গে কথা বলেন।
–কথা বলেন? দেখুন, আমি এটা জানতে চাই, সত্যিই কি তা সম্ভব? পাথরের মূর্তি…
প্রভু আমার সঙ্গে কথা বলেন স্বপ্নে। প্রত্যেক দিন। তিনি হাসেন, গল্প করেন…
এবার আমার হাসি পেয়ে গেল। বায়ুরোগ না থাকলে এরকম স্বপ্ন কেউ দেখে না। আর প্রত্যেকদিন একই স্বপ্ন দেখা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। অন্ধ বিশ্বাস ছাড়া এটা আর কিছুই নয়।
কেষ্টঠাকুরটিরও তো আদ কম নয়। দ্বাপর যুগে যে তিনটি বউ, শ্রীরাধার মতন পরকীয়া এবং আরও ষোলো হাজার গোপিনীর সঙ্গে লীলাখেলা করে গেছে। কলি যুগেও তার এমন দাপট? তার এমনই সেক্স অ্যাপিল যে অনসূয়ার মতন একটি সরল কমনীয় মেয়ে এই আশ্রমেরই আরও কয়েকটি মেয়ের সঙ্গে স্বামী হিসেবে তাকে ভাগ করে নিতেও রাজি?
এর পরেই আমি যে কাণ্ডটি করলুম, যার আপাত কোনও যুক্তি নেই। এটা আমার স্বভাবের সেই দিক, যা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
অনসূয়া বসেছিল দরজার ঠিক কাছের সোফায়। আমি খানিকটা দূরে। হঠাৎ আমি বাঘের মতন এক লাফ দিয়ে উঠে গিয়ে অনসূয়ার পিঠে একটা হাত জড়িয়ে, অন্য হাতে তার থুতনিটা উঁচু। করে চুমু খেলুম। নিছক এক ঠোক্করের চুমু নয়, গভীর, গাঢ় চুমু। প্রথমে সে ঠোঁট খুলতে চায়নি, খানিকটা জোর করেই ঠোঁট ফাঁক করতে হল।
চুমু শেষ করে আমি দ্রুত ফিরে গেলুম নিজের জায়গায়।
ব্যাপারটা এমনই আকস্মিক এবং অচিন্ত্যনীয় যে অনুসূয়া আমাকে ঠিক মতন বাধা দিতেও পারেনি। তা ছাড়া আমার সঙ্গে গায়ের জোরে পারবে কেন? আমি ছেড়ে দিতেই সে প্রথমেই এস্তে জানলার দিকে তাকাল। এটা মেয়েদের সাধারণ ইনস্টিংক্ট। জানলার পাশেই রাস্তা, মাঝে-মাঝে। লোক চলাচল করে, কেউ-না-কেউ না দেখে ফেলতে পারত, দরজাও খোলা, ওর সঙ্গিনীও ফিরে আসতে পারে যে-কোনও মুহূর্তে।
আমার কৈশোর বয়েসে মাসতুতো বোনকে ছাদের সিঁড়িতে জোর করে জাপটে ধরে চুমু খেয়েছিলাম। সে মুখে না-না, এ কী-এ কী বললেও সেটাকে খুব একটা জোর জবরদস্তি বলা যায়।, তার ব্যবহারে যথেষ্ট ইঙ্গিত ছিল। এ ছাড়া আমার বাকি জীবনে আমি কখনও কোনও মেয়ের ওপর জোর করিনি। কবিতা বনিতা চৈব সুখদা স্বয়মাগতা। কবিতা যেমন জোর করে লেখানো যায় না, সেরকম কোনও বনিতাও স্বয়মাগতা হলেই সুখপ্রদা হয়। সহবাস সম্মতি আইনে আমি একেবারে নির্দোষ।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে, অনসূয়ার প্রতি আমার এ ব্যবহার প্রায় বলাক্তারের পর্যায়েই পড়ে। আমি আগের মুহূর্তেও তাকে সিডিউস করার চেষ্টা করিনি। আমি যে পুরোপুরি দোষী, তা আমি স্বীকার করতে বাধ্য।
অনসূয়ার চোখ দিয়ে দরদর করে জল বেরিয়ে আসতে লাগল। নিদারুণ আহত গলায় বলল, এ আপনি কী করলেন? এ আপনি কী করলেন?
সে থরথর করে কাঁপছে। তাকে দেখে আমার মায়া হল, খানিকটা অনুতাপও হয়েছিল কি? না, তা বোধহয় হয়নি। অনুতাপ করলে তো কবেই আমি শুদ্ধ সাত্বিক লোক হয়ে যেতুম।
আমি আবেগহীন গলায় বললুম, তোমাকে হঠাৎ আমার আদর করতে ইচ্ছে হল। হয়তো এটা অন্যায়। অনেকেই তাই মনে করবে। আমি এরকমই।
দুদিকে মাথা নেড়ে সে বলল, না, না, ছি-ছি। কী করলেন? আপনার যদি বিপদ হয়?
আমি বললুম, তুমি চেঁচিয়ে তোক ডাকতে পার। সবকথা বলে দিতে পারো। তোমার কথা সবাই বিশ্বাস করবে।
সে আরও জোরে-জোরে মাথা নাড়তে লাগল আর ফোঁপাতে লাগল।
আমি বললুম, লোকজন এসে যদি শাস্তি দেয়, তা আমি মাথা পেতে নিতে রাজি আছি।
অনসূয়া বলল, আপনার জন্য আমি প্রার্থনা করব।
আমি বুঝতে না পেরে জিগ্যেস করলুম, আমার জন্য প্রার্থনা করবে? কেন? কী প্রার্থনা করবে? আমি যাতে আজ রাত্তিরেই মরে যাই? যাতে কেউ কিছু জানতে না পারে?
অনসূয়ার সারা শরীরটাও আরও জোরে কেঁপে উঠল। সে বলল, না, না, প্রভু যদি রাগ করেন, আপনাকে শাস্তি দিতে চান, আমি ক্ষমা চাইব।
–প্রভু? মানে পাথরের বিগ্রহ?
আবার আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। একটা পাথরের মূর্তি আমার ওপর প্রতিশোধ নেবে? এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? দেখি তো তার কত ক্ষমতা! চ্যালেঞ্জ রইল।
পাপ যদি করে থাকি, তাহলে আর-একটু বেশিই করা যাক।
একইভাবে লাফিয়ে গিয়ে ফের জড়িয়ে ধরলুম অনসূয়াকে। পাগলের মতো আদর করতে-করতে বলতে লাগলুম, এত সুন্দর একটা মেয়ে, সে সারাজীবন শুধু একটা পাথরের সঙ্গে…সে আমার কিছু করতে পারবে না।
অনসূয়া ছটফট করলেও নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারেনি। এবারে শুধু চুমু নয়, আরও আদর দিলুম তার বুকে। তার নীচে আর নামিনি। একটু পরে ফিরে এলুম নিজের জায়গায়।
দরজা-জানলা সব ভোলা। কোনও লোক দেখা যায়নি অবশ্য। অনসূয়া কোনও কথা বলছে না। মুখ ঢেকে কেঁদেই চলেছে।
এবারে আমার অপরাধবোধ অনেক কম। অনসূয়া বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে ঠিকই। কিন্তু তার শরীর যে উষ্ণ হয়ে উঠছিল তাও আমি টের পেয়েছি। শুধু উষ্ণতা নয়, তার বুকে যেন আগুনের হলকা। সাধারণ জৈবিক নিয়মেই তার শরীর সাড়া দিয়েছে। কোনও পাথর কি এই উষ্ণতা জাগাতে পারবে?
বাগানের লোহার গেটে ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হল। অন্য মেয়েটি ফিরে আসছে। অনসূয়াও শুনতে পেয়েছে। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। চোখ-মুখ মুছে নিল ভালো করে। অন্য মেয়েটি বাগান পেরুবার আগেই অনসূয়া ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়ে একবার আমার দিকে সরাসরি চাইল। চক্ষু দুটি লাল, কান্নার ফলে মুখখানি ভাসাভাসা, ঠোঁট ফোলা। ধরা গলায় বলল, আপনার জন্য আমি প্রার্থনা করব প্রত্যেকদিন।
বলাই বাহুল্য, এরপর পাহাড় চূড়ায় সেই আখড়ার উৎসবে আমি যাইনি। ওখানে থেকে আর কেউ আসেনি আমার কাছে। অনসূয়াকে ওই রাস্তা দিয়ে যেতেই দেখিনি। দিনতিনেক পরে ফিরে এলুম কাজের জায়গায়।
শুধু কাজ তো নয়, আবার পার্টি, হইহল্লা, রাত্রি জাগরণ। প্রত্যেকটি দিনই উত্তেজনা ও অস্থিরতাময়। এর মধ্যে ওই নির্জন প্রবাসের স্মৃতি আস্তে-আস্তে ফিকে হয়ে আসে। মাঝে-মাঝে এক-এক ঝলক চোখে পড়ে, তারপর হারিয়ে যায়।
হারিয়ে গেল না অন্য একটি কারণে।
মুম্বই ফেরার ঠিক সাড়ে চার মাস পর আমার জন্ডিস হল। এমনই গুরুতর ধরনের যে ভরতি হতে হল নার্সিংহোমে।
আমাদের হাঁচি-কাশি হলেও কাগজে খবর বেরোয়। রেডিওতে বলে। অনেক ভক্তর চিঠি আসে। দেখতেও আসে অনেকে। আমার একজন সেক্রেটারি আছে বটে, চিঠি সব আমি নিজেই পড়ি। নার্সিংহোমে শুয়ে-শুয়েই অন্য অনেক চিঠির মধ্যে একখানা চিঠি দেখে চমকে উঠতে হল।
নাম সই নেই। গোটা-গোটা বাংলা অক্ষরে লেখা: আমি তিনদিন উপবাসে থেকে আপনার জন্য প্রার্থনা করছি। আপনি ভালো হয়ে উঠবেন। আপনি ক্ষমা পাবেন।
এ-চিঠি নিশ্চিত অনসূয়ার। যাচ্চলে! ওর ধারণা, ওর ভগবান রাগ করে আমাকে এই জন্ডিস রোগের শাস্তি দিয়েছে!
ভগবানগুলো খুব হিংসুটে হয় বটে। ওল্ড টেস্টামেন্টের ঈশ্বর তো নিজের মুখেই বলেছেন, আই অ্যাম অ জেলাস গড। গীতায় শ্রীকৃষ্ণও বলেছেন, মামেকং শরণং ব্রজ। একমাত্র আমাকেই শরণ করো। অন্যান্য ধর্মেরও ঈশ্বর বা অবতাররা বলেছেন, শুধু আমাকেই আশ্রয় করো, অন্য কোনও দিকে তাকাবে না! আরে বাপু, ভগবান হিসেবে যদি তোমার অতই গুণপনা ও আকর্ষণ থাকে, তা তোমাকে নিজের মুখে বলতে হবে কেন?
মুম্বইতে সেবার জন্ডিস প্রায় এপিডেমিকের আকার নিয়েছিল। আমার ওই নার্সিংহোমে প্রায় সব বেডেই জন্ডিসের রোগী। পটাপট করে কয়েকজন মরেও গেছে। তাহলে কি একা আমার অপরাধে অতগুলো লোককে ভগবান শাস্তি দিয়েছে? কিংবা ওই সবকটা লোকই ভগবানের বউদের ধরে টানাটানি করেছে?
একমাত্র এই অপরাধ ছাড়া আর তো কোনও ব্যাপারে ভগবানের রাগারাগির চিহ্ন দেখি না। চতুর্দিকে জাল-জোচ্চুরি, কালোবাজার, নারীহরণ, নারী ধর্ষণ, নারী কেনা-বেচা, মাফিয়ারা থাকছে বুক ফুলিয়ে, রাজনৈতিক নেতাগুলো বদের ধাড়ি, দুকান কাটা, চুরি করছে কোটি-কোটি টাকা, কারুর কোনও শাস্তি হয়?
আমার পাশের বেডে রোগীটির বয়েস তেরো বছর, তার অবস্থা আমার চেয়েও সাংঘাতিক। সে কি অপরাধ বা পাপ করতে পারে?
অনুসূয়া বৈষ্ণব, ক্ষমাই তার ধর্ম। আমার ওই গা-জুয়ারি অপরাধ সে ক্ষমা করে দিয়েছে। কিন্তু তার যে আরাধ্য দেবতা, সে রাগে বা হিংসেয় আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে পারে, এই তার বিশ্বাস।
নাসিংহোম থেকে ছাড়া পেয়ে আরও কিছুদিন আমায় শয্যাশায়ী থাকতে হয়। জন্ডিসের পর নিয়ম-কানুন মানতে হয় অনেক, ভাজাভুজি খাওয়া বারণ, মদ একেবারে নিষিদ্ধ। এ-রোগের ওষুধ বিশেষ নেই, সংযম আর বিশ্রামই আসল। মুম্বইয়ের দিকে যেসব মাছ পাওয়া যায়, সেগুলো ঝোলের বদলে ভাজা খেতেই ভালো লাগে। মাছ ছাড়া আমি ভাত খেতে পারি না। মাঝে-মাঝে মাছ ভাজা খেয়েছি, মদও দু-এক ঢোক খেয়েছি লুকিয়ে। তবু সেরে তো উঠলুম!
আবার গান রেকর্ডিং শুরু করার পর অনসূয়ার কাছ থেকে আর-একটা চিঠি এল। এবারও অস্বাক্ষরিত। আপনি সুস্থ হয়ে ওঠায় আমরা সবাই পুলকিত। আপনার নামে পূজা দিয়েছি। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।
আমি নয়, আমরা? এটাই বৈষ্ণবদেবের ভাষা!
তাহলে আমার অসুখ সারল অনসূয়ার পূজা ও প্রার্থনার জন্য, না আমার মনের জোরে?
এর পরের বছরও আমার নির্জন বাসের দরকার হয়েছিল। দুরানিগঞ্জ যাইনি, গিয়েছিলুম। মধ্যপ্রদেশের বস্তারে। সেখান থেকে ফেরার পর একদিন স্টুডিয়োতে একটি নতুন মেয়ের গান রেকর্ডিং করাবার সময় আমার রক্তবমি হল। বেশ অনেকখানি। প্রথমে ধারণা হয়েছিল, জন্ডিস ভালো করে সারেনি বলেই এই বিপত্তি। ডাক্তাররা জোর করে নার্সিংহোম শুইয়ে দিল। পরে ধরা পড়ল আলসার।
আমার খাওয়া-দাওয়ার কোনও ঠিক নেই, এক-একদিন সারাদিন কিছু খাওয়ার সময়ই পাই না, তারপর সন্ধের সময় প্রচুর ভাজাভুজি, চানাচুর, প্রচুর মদ্যপান, এত সিগারেট, ঘুম কম, আমার আলসার হবে না তো কার হবে?
এর মধ্যেই অনসূয়ার আর-একটা চিঠি চলে এল। ওই একই রকম বয়ান। সে আমার জন্য প্রার্থনা করছে। এই আলসারও ভগবানের রাগের প্রকাশ? এবারে মেরেই ফেলবে নাকি?
এমন কড়া জান, অত সহজে কি যায়? অপারেশন না করিয়েই সেরে উঠলুম। একেবারে ফিট। আবার অনসূয়ার চিঠি। যেন তার প্রার্থনাতেই আমি সেরে উঠেছি!
কি করে ও খবর পায়, কে জানে! মুম্বইয়ের বাঙালিদের মধ্যে-মধ্যে আভাসে-ইঙ্গিতে খোঁজ খবর নিয়েছি, তাদের পরিবারের কোনও মেয়ে বৈষ্ণবী হয়ে আখড়ায় যোগ দিয়েছে কি না। মুম্বইতে এত বাঙালি, কজনেই বা চিনি। কোনও সন্ধান পাইনি। অনসূয়া একবার কোলাপুরের নাম। বলেছিল, হয়তো ও সেখানকারই মেয়ে। কিন্তু কোলাপুরে আর কে খোঁজ নিতে যায়? আমার অত সময়ই বা কোথায়?
মানুষের জীবনে মাঝে-মাঝে কিছু অসুখ-বিসুখ, কিছু দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে যেতেই হয়। বিশেষত আমাদের মতন যাদের বলগা ছাড়া জীবন, সবসময় অনিয়ম, আমাদের ঝুঁকি বেশি।
যখনই এরকম কিছু ঘটে, তখনই অনসূয়ার চিঠি আসে। সাধারণ জ্বর হলেও। যেন তার ভগবান কিছুতেই প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ভুলতে পারছে না। আরে বাবা, তোমার শ্রীকৃষ্ণ সুদর্শন চক্র পাঠিয়ে আমার গলাটা কুচুৎ করে কেটে দিলেই তো পারে। সে চক্ৰখানা কি হারিয়ে গেছে?
একবার একটা দুর্ঘটনা হল ইউরোপে। রাইন নদীর একটা ফেরি পার হচ্ছিলাম। অতি সুদৃশ্য স্টিমার, দু-পাশের দৃশ্যও চমৎকার। বেশ শীত, আমার গায়ে ওভারকোট, দাঁড়িয়েছিলুম বাইরে রেলিং ধরে। হঠাৎ একটা বার্জ এসে স্টিমারটার উলটো দিকে ধাক্কা মারল। খুব জোর ধাক্কা। সেই ইমপ্যাক্ট সামলাতে না পেরে আমি, আরও দুজন ছিটকে পড়ে গেলুম নদীতে।
চলবে--------------------------------------------------------
COMMENTS