humayun ahmed er sritikotha elebele, humayun ahmed er elebele, humayun ahmed er attojiboni elebele new episode, humayun ahmed elebele letest episode,
হুমায়ুন আহমেদ এর আত্মজীবনী/স্মৃতিকথা
"এলেবেল---প্রথম খন্ড"
একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি-----
সম্প্রতি একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম। এলেবেলে লেখা সেটা দিয়েই শুরু করা যাক।
বৈশাখী মেলায় গিয়েছি চার কন্যাকে সঙ্গে করে। তিনটি আমার নিজের, অন্যটি ধার করা। গিয়ে দেখি মেলার ভিড়। ঢাকা শহরের অর্ধেক লোক এসে উপস্থিত। মাটির হাঁড়িকুড়ি যা-ই দেখছে তা-ই তারা কিনে ফেলছে। অনেকটা কচ্ছপের মতো দেখতে কী যে বিক্রি হচ্ছে খুব সস্তায়–এক টাকা পিস। সবাই কিনছে, আমিও কিনলাম। তারপর কিনলাম দুখানা রবিঠাকুর। এবারের মেলায় রবিঠাকু খুব সস্তায় বিক্রি হচ্ছে। চার টাকা জোড়া। আমার ছোট মেয়েটি রবিঠাকুরকে নিয়ে আছাড় খেয়ে পড়ল। তার কিছু হলো না, মহাকবি দুটুকরা হয়ে গেলেন। কান্না থামাবার জন্যে আরেকটি কিনতে হয়। কিন্তু একবার কোনো দোকান ছেড়ে এসে আবার সেখানে ঢোকা অসব। অন্য একটি ঘরে উঁকি দিলাম। বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, আপনাদের রবিঠাকুর আছে। দোকানি আমাকে বেকুব ঠাওরালো কি না জানি না, এক বুড়োর মূর্তি ধরিয়ে দিল। বুড়োটি খালি গায়ে বসে আছে, হাতে ইকো। বাতাস পেলেই সমানে মাথা নাড়ছে। সাদা চুল সাদা দাড়ি রবিঠাকুর যে এতে সন্দেহের কিছুই নেই।
আমরা তালের পাখা কিনলাম, মাটির কলস কিনলাম। শোলার কুমির কিনলাম (কিছুক্ষণের মধ্যেই টিকটিকির মতো এর লেজ খসে পড়ল)। দড়ির শিকা, বাঁকা হয়ে দাঁড়ানো (কলসি কাঁখে) বিশালফা বঙ্গললনা কিনলাম। আমার কন্যার দেখলাম দেশীয় সংকতির প্রতি গাঢ় অনুরাগ নিয়ে জন্মেছে। যা-ই দেখছে তা-ই তাদের চিত্তকে উদ্বেলিত করছে, তা-ই কিনবে। একসময় এদের পিপাসা পেয়ে গেল। চারজনের জন্যে চারটি কাঠি আইসক্রিম কেনা হলো। যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির কথা তে বলেছি, সেটা হলো তখন।
মেজ মেয়ে তার আইসক্রিম আমার দিকে বাড়িয়ে বলল, এক কামড় খাও বাবা। আমি খেলাম এক কামড়। একজন যা করে অন্য সবারও তাই করা চাই। কাজেই অন্য সবাইও আইসক্রিম বাড়িয়ে ধরতে লাগল আমার দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের ঘিরে ছোটোখাটো একটা ভিড় জমে উঠল। দৃশ্যটি অত। চারটি ছোট ছোট মেয়ে আইসক্রিম হাতে দাঁড়িয়ে আছে এবং একজন বয়স্ক লোক ক ক করে সবার আইসক্রিমে কামড় দিচ্ছে। যেন আইসক্রিম খাওয়ার কোনো একটা কমপিটিশন। এর মধ্যেই লক্ষ করলাম অচেনা একটা ছেলে তার বাবাকে বলছে, বাবা, আমিও ওই লোকটিকে আইসক্রিম খাওয়াব। ছেলের হাতে একটা আইসক্রিম। ভয়াবহ পরিস্থিতি। ছেলেটির বাবা আমাকে বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, ভাই কিছু মনে করবেন না। এর আইসক্রিমটায় একটা কামড় দেন। ছেলেমানুষ একটা আবদার করছে।
এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিকেই বোধহয় বেকায়দা অবস্থা বলা হয়। এটা এমন একটা অবস্থা যাকে কিছুতেই কায়দা করা যায় না। অথচ এমন অবস্থায় আমাদের প্রায় রোজই পড়তে হয়।
একবার এক মফল শহরে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল প্রধান অতিথি করে (খুব সবত গুরুত্বপূর্ণ কাউকে তারা রাজি করাতে পারেনি)। অনেক বক্তৃতা-টতৃতার পর শুরু হলো সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। প্রথমেই একক নৃত্য-জলে কে চলে লো কার ঝিয়ারি। চৌদ্দ পনেরো বছরের এক বালিকা কলসি কাখে উপস্থিত হলো। বিশাল কলসি পানিতে কানায় কানায় ভরা। নাচের তালে তালে ছলকে ছলকে পানি পড়ছে। রিয়্যালিস্টিক টাচ দেওয়ার একটা মফলি প্রচেষ্টা। আমি অবাক হয়ে ভাবছি, জলভর্তি কলসি নিয়ে জল আনতে যাওয়ার প্রয়োজনটি কি ঠিক? তখন কলসি নিয়ে সে আছাড় খেল। ছোটখাটো একটা বান ডেকে গেল স্টেজে। প্রধান অতিথি এবং সম্মানিত সভাপতি যেহেতু স্টেজেই উপবিষ্ট ছিলেন, কাজেই তাদেরও সেই জল স্পর্শ করল। দর্শকমহলে তুমুল আনন্দ উত্তেজনা ওয়ান মোর, ওয়ান মোর ধ্বনি। অনুষ্ঠান শেষে আমি ভিজা প্যান্ট নিয়ে বাসে উঠলাম। বাসের সময় যাত্রী খুব সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল আমার দিকে। যার পাশে বসলাম সে অনেকখানি সরে বসল।
এটা হলে বড় ধরনের বেকায়দার গল্প। ছোট ধরনের বেকায়দাও প্রচুর ঘটছে। আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে। একটা উদাহরণ দিলেই আপনারা ধরতে পারবেন। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান কি আপনারা কখনো মন দিয়ে লক্ষ করেছেন? ঠিক আছে, দৃশ্যটি কল্পনা করুন-গুরুগম্ভীর একজন সভাপতি পুরস্কার দিচ্ছেন। পুরস্কার নিচ্ছে একটি তরুণী। সভাপতি ভাবলেন যেহেতু মেয়ে কাজেই সে নিশ্চয়ই হ্যান্ডশেক করবে না। মেয়েটি হাডশেক করতে গিয়ে লজ্জিত হয়ে লক্ষ করল সভাপতি হাত বাড়াচ্ছেন না। সে লাল হয়ে হাত নামিয়ে নিল। ততক্ষণে সভাপতি হাত বাড়িয়েছেন। মেয়েটি হাত নামিয়ে ফেলেছে দেখে তিনিও ঈষৎ লাল হয়ে হাত নামালেন। ইতোমধ্যে মেয়েটি হাত বাড়িয়েছে। সমগ্র দর্শক দারুণ টেনশনে ঘটনার পরিণতির জন্যে উপেক্ষা করছে।
বেকায়দা পরিস্থিতির ব্যাখ্যার জন্যে আবার শিশুদের কাছে ফিরে যাই। আমার ধারণা (এবং বদ্ধমূল বিশ্বাস) শিশুরা বড়দের প্রতি আক্রোশবশত কিছু কিছু পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এর পেছনে শিশুসুলভ সারল্য ফারল্য বলে কিছু নেই। জনৈক দ্রমহিলা খুব দুঃখ করে একটা ঘটনা বললেন, তিনি এক বাসায় বেড়াতে গিয়েছেন। দেখলেন। তিন বছর বয়সী একটি ছেলে পার্টিতে বসে বাথরুম সারছে। ছেলেটি তাকে দেখে লজ্জা পেয়েছে ভেবে তিনি বললেন, বাহ, খুব সুন্দর পার্টি তো তোমার! ভারী সুন্দর। আম এত সুন্দর পার্টি জন্মেও দেখিনি। ছেলেটি কোনো কথা বলল না। গম্ভীর হয়ে রইল। নাশতাটাসতা দেওয়া হয়েছে এমন সময় ছেলেটি এসে ঘোষণা করল, পার্টিটি সে সম্মানিত অতিথিকে দিয়ে দিয়েছে। এখন অতিথিকে সেখানে বসে বাথরুম করতে হবে। ছেলের মা বিব্রত হয়ে বললেন, ছিঃ লক্ষ্মীসোনা, এসব কী বলে? তোমার খালা হয় না?
কিন্তু ততক্ষণে ওর মাথায় ব্যাপারটা ঢুকে গেছে। কাজেই সে হাত-পা ছুড়ে বিকট চিৎকার শুরু করেছে। চায়ের কাপটাপ উল্টে ফেলছে। তাকে সামলাবার জন্যে শেষ পর্যন্ত ভদ্রমহিলাকে পার্টিতে বসার একটা ভঙ্গি করতে হলো।
অনেকেই বলেন শিশুরা সত্যবাদী হয়। আমার মনে হয় না কথাটা ঠিক। তারা সত্যি কথা বলে তখনই যখন কাউকে বিব্রত করা প্রয়োজন হয়। ঘটনাটি বলি।
একজন সংস্কৃতিবান মহিলাকে আমি চিনতাম, যিনি আমার লেখালেখি নিয়ে নানান সময় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন। মাঝে মধ্যেই যেতাম তার বাসায়। সাহিত্য, তার উদ্দেশ্য–ওইসব নিয়ে উচ্চমার্গের কথাবার্তা হতো। সেদিনও তার বাসায় গিয়েছি। বাংলাদেশে কেন তুর্গেনিতের মতো বড় ঔপন্যাসিকের জন্ম হলো না এই নিয়ে কথা হচ্ছে। এমন সময় তার ছোট মেয়েটি হঠাৎ কথা বলল, চাচা, আম্মু না আপনাকে ছাগল ডাকে।
অধিক শোকে পাথর বলে যে কথাটা প্রচলিত আছে সেটা মিথ্যা নয়। ভদ্রমহিলা পাথর হয়ে গেলেন। তুর্গেনিভ প্রসঙ্গ আর জমল না।
এলেবেলে লেখা শেষ করার আগে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি নিয়ে একটি ফরাসি রসিকতা বলি। একজন ফরাসি তরুণী (অবশ্যই রূপবতী এবং…) সন্ধ্যাবেলা তার কুকুরটিকে নিয়ে পার্কে হাঁটতে গেছেন। সেখানে দেখা হলো এক বুড়োর সঙ্গে। বুড়োটিও একটি কুকুর নিয়ে পার্কে এসেছে। না, এই রসিকতাটি বলা যাবে না। রসিকতাটা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে এবং আমার ধারণা উদ-এর পাঠক-পাঠিকারা সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক। এই গল্প তারা হজম করতে পারবে না।
এবারের এলেবেলে-----
এবারের এলেবেলে লেখা আমার ভাগ্নিকে নিয়ে। ওর ডাকনাম লীনা। ভালো নাম হানিফা খাতুন, আমার নানাজানের রাখা। মুরুব্বি মানুষের রাখা নাম, কাজেই হজম করতে হচ্ছে। যদিও বান্ধবীরা তাকে হানিফ সংকেত বলে ডাকা শুরু করেছে। বান্ধবীদেরও দোষ নেই। হানিফ সংকেতের সঙ্গে লীনার চেহারার কিছুটা মিল আছে।
লীনা এবার মেট্রিক পাস করেছে। যে বিষয়টি সে সবচেয়ে কম জানে (সাধারণ গণিত) তাতেই লেটার পেয়ে যাওয়ায় ঘাবড়ে গিয়েছিল। এখন সামলে উঠেছে।
মেট্রিক (থুক্ক, এখন তো আবার এসএসসি বলা নিয়ম) পাশ হওয়ার পরপরই সব মেয়ে খানিকটা আহ্লাদী হয়ে পড়ে। লীনার মধ্যে তা দেখা গেল। সে কথা বলতে লাগল টেনে টেনে এবং খানিকটা নাকি সুরে। আমি কড়া গলায় বললাম, কিরে, এমন টেনে টেনে কথা বলছিস কেন?
লীনা চোখ বড় বড় করে বলল, কখন টে-নে টেনে কথা বললাম?
এই তো বলছিস। ঠিকমতো কথা বল, নয়তো চড় খাবি।
দাও চড় দা-ও।
শোন লীনা, নাক দিয়ে কথা বলছিস ব্যাপারটা কী? নাক নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্যে। কথা বলার জন্যে না। সর্দি লাগলে কী করবি? তখন তো কথা বলা বন্ধ হয়ে যাবে। মুখে কথা বলার অভ্যাসটা বজায় রাখ।
লীনা খানিকক্ষণ মূর্তির মতো বসে রইল, তারপর হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগল। ঘটনাটি সকালবেলার। সারা দিনে বাড়িতে কী ঘটেছে আমি জানি না। একটা কাজে নারায়ণগঞ্জ গিয়েছিলাম। রাত আটটায় বাড়ি ফিরেই শুনলাম লীনা এক বোতল ডেটল খেয়ে ফেলেছে। তাকে নেওয়া হয়েছে হাসপাতালে। ডাক্তাররা স্টমাক ওয়াস করাচ্ছেন। এত খাওয়ার জিনিস থাকতে সে এক বোতল ডেটল কেন খেল জিজ্ঞেস করায় সে বলেছে–বড়মামা আমাকে ইনসাল্ট করেছে, এইজন্যে খেয়েছি। আমি বাঁচতে চাই না। মরতে চাই।
এই হচ্ছে এ যুগের সুপার সেনসিটিভ বালিকাদের একটি নমুনা। আমাদের পাশের ফ্লাটের স্বাতীর কথা বলি। বংশীবাজার কলেজে পড়ে। মাথাভর্তি চুল। খোঁপা খুলে দিলে চুলের গোছা হাঁটু ছেড়ে নিচে নেমে যায়। একদিন তার মা বললেন, কিরে তুই সবসময় চুল এমন এলোমেলো করে রাখিস, খেপা করে রাখতে পারিস না?
স্বাতী গনগনে মুখে বলল, লম্বা চুল অসহ্য। ভাল্লাগে না।
মা বিরক্ত হয়ে বললেন, এত অসহ্য হলে কেটে ছোট কর, কিন্তু পাগলির মতো থাকিস না।
স্বাতী তৎক্ষণাৎ নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে তার বাবার শেভিং রেজার দিয়ে মাথা কামিয়ে ফেলল। তারপর আয়নায় নিজের মূর্তি দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়ে বাঁ হাতের হাড় ভেঙে ফেলল।
স্বাতীর চুল এখন খানিকটা বড় হয়েছে। ছোট ছোট চুলেও তাকে ভালোই দেখায়, কিন্তু আমাদের পাড়ার সমস্ত বালক-বালিকা তাকে ডাকে কোজাক আপা। এই নাম তার কোনোদিন ঘুচবে, এমন মনে হয় না।
আমার বন্ধু মিসির আলী সাহেবের গল্পটা বলি। মিসির আলী সাহেব থাকেন নিউ এ্যালিফেন্ট রোডে। গত শীতের ঘটনা। তিনি ঘরে বসে টিভিতে নবীন শিল্পীদের গানের অনুষ্ঠান দেখছেন। এমন সময় দরজার কড়া নড়ল। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, পনেরো-ষোল বছরের ম্যাক্সিপরা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বিস্মিত স্বরে বললেন, কাকে চাও মা?
মেয়েটি সরু গলায় বলল, আপনাদের কি কোনো কাজের লোক লাগবে?
তোমার কথা বুঝতে পারছি না। কিসের কাজের লোক।
আমি বাড়ি থেকে চলে এসেছি। এখন আমি মানুষের বাড়িতে কাজ করে খাব। আমাকে রাখবেন?
বাড়িতে ঝগড়া হয়েছে?
হ্যাঁ, ড্যাডি আমাকে বকা দিয়েছে।
এসো, ভিতরে এসে বসো। দেখি কী করা যায়।
মেয়েটি খুব সহজেই ভেতরে এসে বসল। নিজেই ফ্রিজ খুলে কোকের বোতল বের করল। সহজ-স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সোফায় পা তুলে টিভি দেখতে লাগল। মিসির আলী সাহেবের স্ত্রী নিউমার্কেট থেকে রাত আটটায় বাড়ি ফিরে একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন। ষোল বছরের একটি অপরিচিত মেয়ে সোফায় আধশোয়া হয়ে আছে। তার দৃষ্টি টিভিতে নিবদ্ধ। মাঝে মাঝে কোকের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে। মিসির আলী পাগলের মতো একের পর এক টেলিফোন করে যাচ্ছেন। মেয়েটি কোত্থেকে এসেছে, কী, কোনোই হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। মেয়ে নির্বিকার। দিব্যি পা নাচাচ্ছে। মিসির আলী সাহেবের স্ত্রীকে এক ফাঁকে শুধু বলল, আন্টি, ডিনারে কী রান্না হয়েছে? আমি কিন্তু ঝাল কম খাই।
দিনকাল পাল্টে গেছে–এ কথাটি সবার মুখেই শোনা যায়, কিন্তু কী পরিমাণ পাল্টেছে তা বলতে পারেন টিনএজদের বাবা-মা। আমার মামাতো বোন বিনুর কথাটা বলি। টিনএজ বলা ঠিক হবে না, অনার্স ফাইনাল দিয়েছে। একদিন দেরি করে বাসায় ফিরল। মেয়ের মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলেন–দুই কানেই নানা জায়গায় ফুটো করা হয়েছে। কান দুটি দেখাচ্ছে মুরব্বার মতো। তিনচার জায়গায় ফুটো করে গয়না পরাই নাকি এখনকার স্টাইল।
গত রমজানের ঈদে তার সঙ্গে আমার দেখা। কানের বিভিন্ন জায়গা থেকে গয়না ঝুলছে। (দুল না বলে গয়না বলছি, কারণ যেসব জিনিস ঝুলছে তার কোনোটাকেই দুলের মতো লাগছে না। একটি দেখতে ঘণ্টার মতো, তার ভেতর থেকে কালো সূতা বের হয়ে এসেছে।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি দেখে বিনু বলল, এরকম করে তাকিয়ো না ভাইয়া, চারটা করে ফুটো করা এখনকার স্টাইল; আমি মোটে তিনটে করিয়েছি।
আমি বিস্ময় গোপন করে বললাম, স্টাইল যখন উঠে যাবে তখন তুই কী করবি? ফুটো বন্ধ করবি কীভাবে?
বিন বড়ই বিরক্ত হলো। কিন্তু সে জানে না বাংলাদেশে চোখধাঁধানো স্টাইল কোনোটাই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এটিও হবে না। বাড়তি ফুটো নিয়ে মেয়েগুলি বড়ই অশান্তিতে পড়বে। কিংবা কে জানে হয়তো এখনি পড়েছে। মাথার চুল দিয়ে কান ঢেকে রাখতে হচ্ছে।
লেখা শেষ করার আগে আবার আমার ভাগ্নির কাছে ফিরে যাচ্ছি। তার ডেটল ভক্ষণের পর থেকে সবার আচার-আচরণে একটা পরিবর্তন হলো। সে যা বলে সবাই তা-ই শোনে। সেনসেটিভ মেয়ে, আবার যদি কোনো কাণ্ডটাও করে বসে। তার এবং তার মায়ের কথাবার্তার কিছু নমুনা দিচ্ছি।
মেয়ে : আজ আমি কলেজে যাব না।
মা : ঠিক আছে মা, যেতে হবে না।
মেয়ে : আমাকে একটা সাইকেল কিনে দেবে? আমি এখন থেকে সাইকেলে করে কলেজে যাব।
মা : বিকেলে নিউমার্কেটে গিয়ে কিনে নিস। তোর বাবাকে বলে দেব।
বাসার অবস্থাটা বোঝানোর জন্যে এই ডায়ালগ কটিই যথেষ্ট। গত বুধবারে গিয়েছি, ওদের ওখানে দেখি এক বখা ছেলে ড্রইংরুমে বসে আছে। ছোকরার গেঞ্জিতে লেখা পুশ মি। তার হাতে সিগারেট। সে সিগারেট টানছে দম দেওয়ার ভঙ্গিতে। ঘর ধোয়ায় অন্ধকার।
আমি আপাকে বললাম, ওই চিজটা কে?
আপা গলার স্বর খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ও লীনার একজন চেনা ছেলে। তুই লীনাকে কিছু বলিস না। সেনসেটিভ মেয়ে কী করতে কী করে বসবে। আমি ভয়ে ভয়ে থাকি।
আমি কিছুই বললাম না। গুম হয়ে বারান্দায় বসে রইলাম। কিছুক্ষণ পরই উজ্জ্বল চোখে লীনা ঢুকল। হাতটাত নেড়ে বলল, মামা, কী কাণ্ড হয়েছে দেখে যাও। সবুজ একটা চিরুনি দিয়ে তার দাড়িতে আঁচড় দিতেই তেরটা উকুন পড়েছে। এদের মধ্যে চারটা লাল রঙের। প্লিজ মামা, দেখে যাও।
আমি কঠিন মুখে বসে রইলাম। আপা মৃদুস্বরে বলল, যা দেখে আয়। এত করে বলছে। সেনসেটিভ মেয়ে।
আমি দেখতে গেলাম। টেবিলের ওপর একটা সাদা কাগজ। সেখানে সত্যি সত্যি তেরটা মিডিয়াম সাইজের উকুন। কয়েকটির পেট লালাভ।
সবুজ আমাকে দেখে দাঁত বের করে বলল, মামার কাছে সিগ্রেট আছে? আই এ্যাম রানিং শর্ট।
পাড়ার মজিদ সাহেব-----
আমাদের পাড়ায় মজিদ সাহেব নামে পুলিশের একজন রিটায়ার্ড এসপি থাকেন। তার স্বভাব হচ্ছে দেখা হওয়া মাত্র অত্যন্ত চিন্তিত মুখে হাই ফিলসফি গোছের একটা প্রশ্ন করা। মহা বিরক্তিকর ব্যাপার। সেদিন মোড়ের দোকানে সিগারেট কিনছি। হঠাৎ লক্ষ করলাম মজিদ সাহেব হনহন করে আসছেন। আমি চট করে একটু আড়ালে চলে গেলাম। লাভ হলো না। ভদ্রলোক ঠিক আমার সামনে এসে ব্রেক করলেন এবং অত্যন্ত গম্ভর গলায় বললেন, প্রফেসর সাহেব, মানুষ হাসে কেন একটু বলুন তো?
আমি বিরক্তি চেপে বললাম, হাসি পায় সেইজন্যে হাসে।
হাসি কেন পায় সেইটাই বলুন।
এ তো মহা যন্ত্রণা। ভদ্রলোক যেভাবে দাঁড়িয়ে আছেন তাতে মনে হচ্ছে জবাব না বনে তিনি যাবেন না। তাঁর না হয় কাজকর্ম নেই, রিটায়ার্ড মানুষ; কিন্তু আমার তো কাজকর্ম আছে। আমি বললাম, মজিদ সাহেব আমি আপনাকে একটা গল্প বলি। গল্পটা শুনে আপনি হাসবেন। তারপর আপনি নিজেই চেষ্টা করে বের করুন কেন হাসলেন।
এটা মন্দ নয়। বলুন আপনার গল্প।
আমি গল্প শুরু করলাম–এক লোক একটি সিনেমা একত্রিশবার দেখেছে শুনে তার বন্ধু বলল, একত্রিশবার দেখার মতো কী আছে এই সিনেমায়? লোকটি বলল, সিনেমার এক জায়গায় একটি মেয়ে নদীতে গোসল করতে যায়। সে যখন কাপড় খুলতে শুরু করে ঠিক তখন একটা ট্রেন চলে আসে। একত্রিশবার ছবিটা দেখেছি, কারণ আমার ধারণা কোনো না কোনোবার ট্রেনটা লেট করবে।
মজিদ সাহেব আমার দিকে হা করে তাকিয়ে রইলেন। অবাক হওয়া গলায় বললেন, ট্রেন লেট হবে কেন? প্রতিবার তো একই ব্যাপার হবে।
আমি বললাম, হাসিটা তো এইখানেই।
একই ব্যাপার প্রতিবারই ঘটেছে, এর মধ্যে হাসির কী?
মজিদ সাহেব গম্ভীর মুখে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। মনে হলো আমার ওপর খুব বিরক্ত। আমি যে অভিজ্ঞতার কথা বললাম, এ জাতীয় অভিজ্ঞতা আপনাদের সবারই নিশ্চয়ই আছে। অনেক আশা নিয়ে একটি রসিকতা করলেন। সেই রসিকতাটা ব্যাঙের মতো চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে গেল।
আমেরিকান এক বইতে একশটি রসিকতা দেওয়া আছে এবং বলা হয়েছে এই রসিকতাগুলির সাফল্যের সম্ভাবনা শতকরা নিরানব্বই দশমিক তিন দুই ভাগ। আমি এর একটা এক বিয়েবাড়ির আসরে চেষ্টা করে পুরোপুরি বেইজ্জত হয়েছি। একজন শুধু আমার প্রতি করুণার বশবর্তী হয়ে একটু ঠোঁট বাঁকা করেছিলেন। কিন্তু অন্যদের গম্ভীর মুখ দেখে সেই বাকা ঠোঁট সোজা করে জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলেন। জনৈকা তরুণী চশমার ফাঁক দিয়ে এমনভাবে আমাকে দেখতে লাগল যেন আমার মাথায় দোষ আছে।
গল্পটা এরকম—
এক বন্ধু অন্য বন্ধুকে জিজ্ঞেস করছে, প্যারিস শহরটা কেমন?
বন্ধু বলল, ভালো। সেখানে এয়ারপোর্টে নেমে তুই যদি একটা মোটর গাড়ি ভাড়া করিস, তাহলে দেখবি সেই ড্রাইভার তোর সঙ্গে কী ভদ্র ব্যবহার করছে। এমনও হতে পারে সে তোকে তার বাড়িতে নিয়ে যাবে। রাখবে তার বাড়িতে। নাচ-গান করবে। এবং এই যে তুই তার বাড়িতে থেকে এত আনন্দ ফুর্তি করলি, তার জন্যে উল্টো তোকে একগাদা টাকা দিবে।
বলিস কী! তুই গিয়েছিলি নাকি প্যারিসে?
আমি যাইনি, আমার বউ গিয়েছিল। তার প্র্যাকটিক্যাল এক্সপিরিয়েন্স। সে তো আর বানিয়ে বানিয়ে বলবে না। এরকম মেয়েই সে নয়।
এই গল্পে কেউ হাসল না কেন? আমি ভেবেটেবে বের করলাম–এরকম একটি ভেলা যুবকের এমন বউ থাকতেই পারে না যে একা একা প্যারিসে যাবে। এই কারণেই গল্পটি কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না।
কী যন্ত্রণা, হাসির গল্পের আবার বিশ্বাসযোগ্যতা কী! আমাদের মুশকিল হচ্ছে সিরিয়াস গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। হাসির গল্প হলেই গম্ভীর হয়ে ভাবতে বসি, গল্পটি কি বিশ্বাসযোগ্য? ভেন্দা ধরনের ছেলেটার বউ প্যারিসে কেন গেল?
রসিকতা যারা করেন তারা বেইজত হওয়ার আশঙ্কা মাথায় নিয়েই করেন। নো রিক নো গেইন-এর ব্যাপার এবং দুএকটা যন লেগে যায় তাদের উৎসাহের সীমা থাকে না। রসিকতা করাটাকে তখন তারা পবিত্র দায়িত্ব মনে করেন। আগাড়ে বাগাড়ে রসিকতা করে আশেপাশের মানুষদের বিরক্তির চরম সীমায় পেীছে দেন। আমি একবার শামণী থেকে নিস্তান যাওয়ার পথে এরকম একজনের দেখা পেয়েছিলাম। বাসে অব ভিড়। প্রচণ্ড গরম। ঘামের কটু গন্ধ। এর মধ্যে একজন তার পরিচিত একজনকে পেয়ে গেলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বললেন, এই মোজাম্মেল, একটা চুটকি শোন। একবার এক বিয়েবাড়িতে বরযাত্রী আসতে দেরি করছে, তখন বরের ফুফাতো বোন…
মোজাম্মেল যার নাম সে একবার অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল। তাতে লাভ হলো না। ভদ্রলোক দীর্ঘ গল্প শেষ করে দ্বিতীয় গল্প শুরু করলেন। টাক-মাথায় এক লোক বিরক্ত হয়ে বললেন, চুপ করেন তো ভাই।
কেন চুপ করব? আপনার কী অসুবিধা করলাম?
কানের কাছে ভ্যান ভ্যান করছে, এটা অসুবিধা না?
ভ্রলোক চুপ করে গেলেন। সায়েন্স ল্যাবরেটরি পর্যন্ত এসেই আবার তার গলা খুসখুস সুতে লাগল। তিনি মোজাম্মেলকে তিন নম্বর রসিকতাটি বললেন। অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার, এই রসিকতাটি হিট করল। বাসসুদ্ধ লোক হু-হু করে হেসে উঠল। এমনকি সেই টাক মাথার লোক ঠা ঠা জাতীয় বিচিত্র শব্দ করে হাসতে লাগলেন।
অবশ্যি এ সংসারে কিছু ভাগ্যবান লোক আছেন, তাদের সব রসিকতাই পাবলিকে খায়। এটা বিরাট একটা যোগ্যতা। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, যারা এই যোগ্যতা অর্জন করেন অল্পদিনের মধ্যেই তাদের কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে যেতে দেখা যায়। জীবনের প্রতি সব রকম আকর্ষণ হারিয়ে ফেলতে থাকেন। চল্লিশ না হতেই তাদের দেখা যায় পঞ্চাশের মতো। কারণ খুব সহজ, এই জাতীয় জন্মরসিকদের সব কথাকেই আমরা সবাই রসিকতা হিসেবে নেই। যা একসময় জন্মরসিকের ওপর মানসিক চাপ ফেলতে শুরু করে। উদাহরণ দেই, আমার এক বন্ধু আব্দুস সোবাহান একজন জন্মরসিক। স্কুলজীবন। থেকে সে আমাদের হাসাচ্ছে। কলেজ জীবনেও একই অবস্থা। সংসারে ঢুকে সে নানান। সমস্যায় পড়ল। অল্প বেতন। অনেকগুলি ছেলেপুলে, অভাব-অনটন। একেকবার সে দুঃখের গল্প করে, আমরা হেসে গড়িয়ে পড়ি। একবার বিকেলবেলা মুখ শুকনো করে। বলল, ঘরে আজ রান্না হয় নাই ভাই। একটা পয়সা ছিল না।
তার কথা শুনে হাসতে হাসতে আমাদের পেটে খিল ধরে যাওয়ার মতো অবস্থা। কী মজার ব্যাপার, ঘরে পয়সা নেই।
শেষ করার আগে এই প্রসঙ্গে একটা দামি উপদেশ দিতে চাচ্ছি। অল্পবয়সা মেয়েদের সঙ্গে কখনো কোনো রসিকতা করবেন না। যদি এদের কোনো একটি রসিকতা পছন্দ হয়ে যায় তাহলে আপনার অবস্থা কাহিল। ওই গল্পটা আরেকবার বলেন না। ওই গটা আরেকবার বলেন না।
শিরীন নামের এক মেয়েকে কোন এক কুক্ষণে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার একটা গল্প বলেছিলাম। তারপর থেকে যেখানেই তার সঙ্গে দেখা হয় সে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে এবং বলে-ওই গল্পটা আরেকবার বলেন, প্লিজ।
আমাকে বলতে হয়। তিন বছরের মধ্যে আমি হাজার খানিকবার এই গল্প বললাম। জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। নাসিরুদ্দিন হোজ্জাকে কাছে পেলেই কাঁচা খেয়ে ফেলি এমন অবস্থা। সেই সময়কার কথা, নিতান্ত উপায়ান্তর না দেখেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রাডারের প্রেসার কমাচ্ছি মনে মনে প্রার্থনা করছি যেন পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা না হয়। ঠিক তখন আমার পেছনে একটা রিকশা থামল। আমার বুক ধক করে উঠল। শিরীনের আদুরে গলা, হুমায়ূন ভাই, এখানে কী করছেন?
আমি মনে মনে বললাম, হারামজাদি দেখছিস না কী করছি? দ্রুত জিপার লাগাতে গিয়ে আরেকটা অ্যাকসিডেন্ট হলো। জিপার দেওয়া প্যান্ট যারা পরেন তাদের জীবনে এ জাতীয় দুর্ঘটনা একাধিকবার ঘটে। তবু ফ্যাকাসে হাসি হেসে বললাম, তারপর কী খবর, ভালো তো?
শিরীন বলল, এ হচ্ছে আমার বান্ধবী লোপা, আপনি একে ওই গল্পটা বলেন তো। প্লিজ। না না, বলতেই হবে। আমি কোনো কথা শুনব না।
সেই থেকেই আমি কারও সঙ্গে রসিকতা করতে পারি না। কারও রসিকতা শুনে হাসতেও পারি না। রিটায়ার্ড এসপি মজিদ সাহেবের মতো নিজেকে প্রশ্ন করি, মানুষ হাসে কেন?
পুনশ্চ : উন্মাদ-এর পাঠকদের জন্যে একটি রসিকতা। এই রসিকতা অনেকটা আইকিউ টেস্টের মতো। এটা শুনে যদি কেউ যদি হাসে তাহলে বুঝতে হবে তার বুদ্ধি কম। যে যত শব্দ করে হাসবে সে তত বোকা। যদি না হাসে তাহলে বুদ্ধিমান। যদি বিরক্ত হয় তাহলে আঁতেল।
এক লোক কানে কম শোনে।
সে তার বেগুনক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। পথচারী এক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, আপনার ছেলেপুলে কী?
লোকটি বলল, বছরে দুই একটা হয়। আগুন দিয়ে পুড়িয়ে খাই।
পাগলরা সবচেয়ে ভালো উপদেশ দেয়-------
কোথায় যেন পড়েছিলাম পাগলরা সবচেয়ে ভালো উপদেশ দেয়। কথাটির তেমন গুরুত্ব দিইনি। কারণ উপদেশ দেয় এ জাতীয় পাগল আমার চোখে পড়েনি। বহুকাল আগে যখন ফুলবাড়িয়াতে রেলস্টেশন ছিল তখন একজনকে দেখেছিলাম। সে ট্রেনের ইঞ্জিনগুলিকে গম্ভীর গলায় উপদেশ দিচ্ছিল–বাবারা লাইনে থাকিস। নিঃসন্দেহে ভালো উপদেশ। তবে ইঞ্জিনগুলি এই উপদেশকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে সেটা বলা মুশকিল।
কিছুদিন আগে আমি কি এক পাগলের কাছ থেকে সত্যি সত্যি একটা ভালো উপদেশ পেলাম। এই পাগল হচ্ছেন আমার দূরসম্পর্কের মামা। ঝিগাতলায় থাকেন। অত্যন্ত ভালোজাতের পাগল। হইচই নেই, গোলমাল নেই–মধুর স্বভাব। মুখে হাসি লেগেই আছে। কথাবার্তাও খুব স্বাভাবিক। তাঁর পাগলামির একমাত্র নমুনা হচ্ছে, মামিকে দেখলেই শিশুদের মতো এক বিঘৎ জিহ্বা বের করে ভেংচি দিতে থাকেন। যতক্ষণ মামি সামনে থাকেন ততক্ষণ এই অবস্থা। মামি প্রথমদিকে খুব কান্নাকাটি করতেন। দেয়ালে কপাল। তন। এখন সহ্য করে নিয়েছেন। পারতপক্ষে সামনে আসেন না, আর এলেও লম্বা ঘোমটা দিয়ে থাকেন।
এই মামার সঙ্গে এক সন্ধ্যাবেলায় আমার দেখা। তিনি বললেন, সেজেগুঁজে যাচ্ছিস কোথায়?
বিয়েবাড়িতে যাচ্ছি মামা। বৌ-ভাতের দাওয়াত।
মামা সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে একটি উপদেশ দিলেন। নিচুগলায় বললেন, যেতে বসার সময় গুনে গুনে তিন নম্বর চেয়ারে বসবি। শুরু থেকে এক দুই করে তিন নষটায়।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন?
রেজালার বাটি সবসময় তিন নম্বর চেয়ারের সামনে পড়ে।
আমি সেদিন সত্যি সত্যি তিন নম্বর চেয়ারে বসেছিলাম এবং সামনে রেজালার বাটি পেয়েছি। এখনো তাই করি এবং হাতে হাতে ফল পাই। যেসব পাঠক-পাঠিকা আমার এলেবেলে পড়েন তাদেরকে বলছি, ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখুন।
আগের কথায় ফিরে যাই। মামার উপদেশ শোনার পর থেকে পাগলদের উপর আমার ভক্তি-শ্রদ্ধা বেশ খানিকটা বেড়ে যায়। আমার ধারণা, এরা নিজের এবং চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কে বেশ ভালো রকম চিন্তাভাবনা করে এবং এদের লজিকও বেশ পরিষ্কার। তার চেয়েও বড় কথা, এদের বসবোধ আমাদের চেয়েও ভালো।
আমি এক রাজনৈতিক সভায় জনৈক পাগলের কাণ্ডকারখানা দেখে এদের রসবোধ সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হই। বেশ উষ্ণ বক্তৃতা হচ্ছিল। রোগামতো এক নেতা গণতন্ত্রের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন, তখন অঘটন ঘটল। এক পাগল উঠে দাঁড়াল এবং অবিকল ওই নেতার মতো হাত-পা নেড়ে বক্তৃতা শুরু করল। তার বক্তৃতা আরও জ্বালাময়ী। আমরা সবাই নেতাকে বাদ দিয়ে তার কথা শুনছি এবং বিমলানন্দ ভোগ করছি। রোগা নেতা তীব্ৰদৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন পাগলের দিকে। বুঝতে পারছি ভদ্রলোক যথেষ্ট অপ্রস্তুত বোধ করছেন। তিনি বেশ কয়েকবার হ্যালো হ্যালো মাইক্রোফোন টেস্টি ওয়ান, টু, থ্রি বলে শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেষ্টা করলেন। পারলেন না। কারণ ততক্ষণে পাগলের ভেতর জজবা এসে গিয়েছে, সে অত্যন্ত উঁচুগলায় বস্ত্র সমস্যার সমাধান করিতে হইবে বলে নিজের লুঙ্গি খুলে গামছার মতো কাঁধে ফেলে দিয়ে হাসিমুখে তাকাচ্ছে সবার দিকে। আমরা তুমুল করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দিত বুলাম। নোগা নেতার ইশারায় কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে ঘাড় ধরে বের করে আবার সভার কাজ শুরু হলো। কিন্তু সভা আগের মতো আর জমল না। নেতা আবেগকম্পিত গলায় যা-ই বলেন শ্রোতারা দাঁত বের করে হাসে। নেতা তার বক্তৃতায় ফর্মুলামতো যেই বস্তু-সমস্যার কথায় এসেছেন অমনি লোকজন চেঁচাতে শুরু করল-পায়জামা খুইল্যা তারপরে কন। আগে পায়জামা খুইলা কান্দে ফেলেন। হে হে হে। হো হো হো।
পাঠক-পাঠিকাদের মধ্যে কেউ কেউ ভাবতে পারেন নেতাদের ব্যঙ্গ করার জন্যে উপরের ঘটনাটি আমি বানিয়েছি। এত সাহস আমার নেই। নেতাদের আমি বড় ভালোবাসি। যে পাগলটির কথা বললাম, সে ঢাকা শহরের একজন পুরনো পাগল। যেসব মেয়ে ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে রোকেয়া হলে থাকতেন তারা এই পাগলকে ভালো করেই চেনেন। সেই সময়ে এই পাগলকে প্রায়ই হলের গেটের কাছে দেখা যেত। লাজুক ধরনের মেয়েদের কাছে গিয়ে অত্যন্ত বিনয়ী ভঙ্গিতে বলত–আপা, একটা জিনিস দেখবেন? মেয়েটি হ্যাঁ-না কিছু বলার আগেই সে লুঙ্গি খুলে ফেলার একটা ভঙ্গি করত। মেয়েটি চিৎকার করে ছুটে যেত হল গেটের দিকে। পাগল মজা পেয়ে মিটিমিটি হাসত শুনেছি একবার নাকি একটা সাহসী মেয়ে বলেছিল–হ্যাঁ, দেখব। এতে পাগল খুব বিমর্ষ হয়ে পড়ে। মুখ কালো করে চলে যায়। এরপর থেকে এই অঞ্চলে তাকে আর তেমন দেখা যায়নি।
নাগরিক পাগলদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক প্রায় নেই বললেই চলে। সেই তুলনায় গ্রামের পাগলদের সঙ্গে গ্রামবাসীদের অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক থাকে। সবাই নিশ্চয়ই জানেন, প্রতিটি গ্রামে একজন মহা বোকা এবং একজন পাগল থাকে। এদের দুজনের কাজ হচ্ছে গ্রামবাসীর জন্যে নির্দোষ বিনোদন সরবরাহ করা। বিশেষ করে গ্রামে যখন বরযাত্রী আসে বা অতিথি আসে তখন পাগল এবং মহা বোকাকে সমাদরের সঙ্গে তাদের সামনে উপস্থিত করা হয়। যাতে অতিথিরা পাগলামি এবং বোকামি দেখে বিমলানন্দ উপভোগ করতে পারেন।
আমাদের গ্রামের যে পাগল ছিল তার নাম নও পাগল। তার পাগলামির লক্ষণ হচ্ছে সে একটা লম্বা লাঠি মাটিতে রেখে বলবে–তিন হাত পানি। সারাক্ষণই সে বিভিন্ন জায়গায় লাঠি রেখে পানি মাপছে। কখনো তিন হাত কখনো পাঁচ হাত। যাই হোক, একবার বরযাত্রী এসেছে, সবাই ধরে নিয়ে এল নশুকে। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, পানি কতটুকুরে নও? লাঠি দিয়ে মেপে বল দেখি।
নশু অবাক হয়ে বলল, শুকনা খট খট করতাছে। পানির কথা কী কন?
সবাই রেগে আগুন। কড়া গলায় বলল, লাঠি দিয়ে মেপে ঠিকমতো বল হামারজাদা তিন হাত পানি না পাঁচ হাত পানি।
নশু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, পানি তো দেখি না। এইসব কী কন? পাগলের কথাবার্তা।
নশুকে ধরে শক্ত মার দেওয়া হলো। গ্রামের বেইজ্জতি হয়ে যাচ্ছে, সহ্য করা মুশকিল। মার খেয়ে নশুর বুদ্ধি খুলল। লাঠি মাটিতে ধরে বলল, সাড়ে চাইর হাত পানি।
সবার মুখে হাসি ফিরে এল। বরযাত্রীদের একজন বলল, পানি বাড়ছে না কমছে।
বাড়ছে। এখন হইছে পাঁচ হাত।
ঘামে শান্তি ফিরে এল। আধঘণ্টা ধরে নও বরযাত্রীদের সামনে বিভিন্ন জায়গায় লাঠি রেখে পানির উচ্চতা বলতে লাগল। বরযাত্রীরা মহা খুশি।
আমার মনে হয়, শুধু গ্রামে নয় সমাজের প্রতিটি স্তরে একজন করে পাগল দরকার। লেখক এবং কবিদের মধ্যেও দরকার একজন পাগলা-লেখক কিংবা কবি। ঠিক তেমনি পত্রপত্রিকার মধ্যে একটি পাগল পত্রিকা দরকার, যেমন উন্মাদ।
পুনশ্চ : পাগলদের নিয়ে আমি কয়েকদিন আগে একটা চমৎকার রসিকতা পড়লাম। আপনাদের কেমন লাগবে বুঝতে পারছি না, তবু বলছি। মি. জোনসের ইনসমনিয়া হয়েছে। পরপর চার রাত অনুমো থেকে অবস্থা কাহিল। নানান ধরনের সিডেটিভ দিয়েও কাজ হলো না। তখন মি. জোনসের আত্মীয়স্বজন একজন সাইকিয়াট্রিস্টকে আনলেন। সাইকিয়াট্রিক্ট বললেন, রোগীকে হিপনোটইজ করে ঘুম পাড়িয়ে দেব। এই বলে তিনি রোগীর সামনে হাত নাড়তে নাড়তে বললেন, ঘুম আসছে, আপনার চোখে নেমে আসছে ঘুম। বাইরের জগৎ-সংসার আপনার কাছে বিলুপ্ত। আপনার চোখে তন্ত্ৰা। এই তো চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। নিঃশ্বাস হচ্ছে ভারী। সত্যি সত্যি জোনসের চোখ বন্ধ হয়ে এল। নিঃশ্বাস হলো ভারী। ডাক্তার ভিজিট নিয়ে দরজার বাইরে যেতেই মি. জোনস চোখ মেলে ভয়ার্ত গলায় বললেন, পাগল বিদেয় হয়েছে?
সাহিত্য বাসর-----
আমাদের পাড়ায় সাহিত্য বাসর নামে চ্যাংড়া ছেলেপুলেদের কী যেন একটা সংগঠন আছে। এদের কাজ হচ্ছে দুদিন পর পর মাইক লাগিয়ে পাড়ার সবাইকে বিরক্ত করা। গল্পপাঠের আসর, কবিতা সন্ধ্যা, ছড়া বিকেল, বৃন্দ আবৃত্তি–একটা-না-একটা লেগেই আছে। এসব ঝামেলা ঘরে বসে সেরে ফেললেই হয়, তা করবে না। প্যান্ডেল খাটাবে, মাইক ফিট সুবে–বিরাট জলসা। পয়সা কোত্থেকে পায় কে জানে। দেশ যখন বন্যার পানিতে ডুবে গেল তখন সাহিত্য বাসর-এর অনুষ্ঠানের ধুম পড়ে গেল। বন্যার্তদের সাহায্যার্থে কমিক অনুষ্ঠান, বিচিত্রা অনুষ্ঠান, আনন্দ মেলা।
এই পর্যায়ের শেষ অনুষ্ঠানটি হলো আপনার কি আছে?
আগে ব্যাপারটি সম্পর্কে আপনাদের একটু বলে নেই। তারপর মূল ঘটনায় যাব।
ছুটির দিন সকালবেলায় আরাম করে দ্বিতীয় কাপ চায়ে চুমুক দিচ্ছি, সাহিত্য বাসরের দলবল উপস্থিত। সবার মুখেই হাসি। হাসি দেখেই আঁতকে উঠতে হয়। কাম এরা সহজে হাসে না। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম, কী ব্যাপার?
আমরা মারাত্মক একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করছি স্যার। নাম হচ্ছে আপনাদের কি আছে? বন্যার্তদের সাহায্যের জন্যে।
বাহ, খুব ভালো।
একটা ইউনিক আইডিয়া। গানবাজনা কিছু না। ফাঁকা স্টেজ। স্টেজের মাঝখানে একজন ভিখারি বসে থাকবে, গায়ে কোনো কাপড় নেই। শুধু কলাপাতা দিয়ে লজ্জাটা ঢাকা। তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে মাইকে বলা হবে—আপনার অনেক আছে, এর কিছুই নেই। একে কিছু দিন। তখন দর্শকের মাঝখান থেকে একজন উঠে আসবে। সে তার মানিব্যাগ-শার্ট-গেঞ্জি এসব খুলে দেবে। প্রচণ্ড হাততালি। ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক–;ওই মহামানব আসে। আইডিয়া কেমন স্যার?
খুব ভালো, তোমাদের ধারণা লোকজন সব স্টেজে এসে সব খুলে দিয়ে চলে যাবে?
শুরুতে যাবে না। তবে প্রথম কয়েকজন যখন সাহস করে যাবে তখন ফ্লো এসে যাবে। আপনি তো জানেন স্যার, বাঙালি হচ্ছে হুজুগে জাতি। ফ্লোর ওপর চলে।
তা ঠিক।
এখন আপনি হচ্ছেন আমাদের ভগরসা।
আমি মনের উদ্বেগ বহুকষ্টে চাপা দিয়ে বললাম, আমি রসা মানে?
প্রথম যে মানুষটি যাবে সে হচ্ছে আপনি। এপাড়ায় আপনার একটা ইজ্জত আছে। প্রফেসর মানুষ, প্রথম আপনি গেলে অন্যরকম এফেক্ট হবে। একটু হাইড্রামা, স্যার করতেই হবে–উপায় নেই।
কী রকম হাইড্রামা?
সব কাপড়চোপড় আপনাকে খুলে ফেলতে হবে। তারপর আমরা আপনাকে ঠিক ভিখিরির মতো একটা কলাপাতা দিয়ে জড়িয়ে দেব। আপনি কিন্তু না বলতে পারবেন না। রিকোয়েস্ট।
উন্মাদ-এর পাঠক-পাঠিকা, আমি কী করে সেই বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম সেই দীর্ঘ কাহিনী বলতে চাই না। তবে অনুষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত কী রকম হলো সেটা বলছি।
অনুষ্ঠান শুরু হলো সন্ধ্যায়। প্রধান অতিথি চলে এলেন। তার নাম বলছি না। কারণ তিনি একজন পেশাদার প্রধান অতিথি। সবাই একে চেনেন। ঢাকা শহরের শতকরা আশি ভাগ অনুষ্ঠানে তিনি হয় প্রধান অতিথি, কিংবা বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকেন। চমৎকার একটি বক্তৃতা দেন। যে ফুলের মালাটি তাকে দেওয়া হয় সেটি তিনি একটি শিশুর গলায় পরিয়ে অত্যন্ত নাটকীয় কায়দায় শিশুটির কপালে চুমু খান। তখন বিক্ষিপ্তভাবে হাততালি পড়ে। যাই হোক, এই প্রধান অতিথি ভদ্রলোক সম্ভবত অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আগে কিছু জানতেন না। যখন দেখলেন স্টেজে কলাপাতা গায়ে এক নেংটো ভিখারি বসে আছে তখন স্বভাবতই ঘাবড়ে গেলেন।
তারপর যখন মাইকে অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয় তখন প্রধান অতিথি শুকনো গলায় বললেন, এসব এরা কী বলছে? হোয়াট ডু দে মিন।
আমি তাকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ততক্ষণে মাইকে উদাত্ত গলায় বলা হচ্ছে এবার আমাদের এই অনুষ্ঠানে প্রথম যিনি তার সর্বস্ব দিয়ে এক অনুপম আদর্শের সূচনা করবেন তিনি হচ্ছেন আমাদের অতি আদরের প্রধান অতিথি বিশিষ্ট সাহিত্যবোদ্ধা অনলবর্ষী বক্তা, সমাজের বন্ধু, অভাজনের চোখের মণি…। প্রধান অতিথি কাঁপাগলায় আমাকে জিজ্ঞেস করলেন দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় বোধহয় নেই। আমি কোনো উত্তর দিলাম না। সাহিত্য বাসরের কর্মীরা কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে ঠেলাঠেলি। করে স্টেজে উঠিয়ে দিল। ব্যাকগ্রাউন্ডে গান হতে লাগল ওই মহামানব… ও… আসে। যেরকম আশা করা হয়েছিল সেরকম হলো না। বাঙাল হুজুগে জাতি হলেও এই হুজুগে তারা মাতলো না, দ্রুত মাঠ খালি হয়ে গেল। শুধু প্রধান অতিথি একটি কলাপাতায় লজ্জা নিবারণ করে ত্রিভ মুরারী হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
পাঠক-পাঠিকারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন গলায় ফুলের মালা, সামনে পিরিচে ঢাকা পানির গ্লাস নিয়ে যিনি শান্ত সমাহিত ভঙ্গিতে বসে থাকেন তাকে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অন্য শ্রোতাদের মতো তিনি ঘুমিয়ে পড়তে পারেন না। অসুবিধা জায়গায় চুলকানি শুরু হলে চুলকাতে পারেন না। হাসিমুখে বসে থাকতে হয় এবং ভান করতে হয় বিমলানন্দ উপভোগ করছেন। প্রফেশনালরা এই কাজটা ভালোই করেন। অসুবিধা হয় যারা প্রফেশনাল না তাদের। আমার নিজের দেখা একটি দৃশ্য বলছি। বাংলাদেশ পুষ্পপ্রেমীদের একটি অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি হচ্ছে হাজী আসমত আলী বেপারী। ইনি কিছুদিন হলো শুকনো মরিচের ব্যবসা করে প্রচুর পয়সা করেছেন। তাকে প্রধান অতিথি করার একটিই উদ্দেশ্য, কিছু পয়সাকড়ি পাওয়া।
হাজী আসমত আলী বেপারী চোখ বড় করে দুঘণ্টার মতো সময় মূর্তির মতো কাটালেন। তারপরই সম্ভব-অসম্ভব জায়গায় চুলকাতে শুরু করলেন। প্রধান অতিথিকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্যে নিয়ে যাওয়া হলো এবং কানে কানে বলা হলো ফুলের ওপর দুএকটা কথা বলবেন। বেশি কিছু বলার দরকার নেই।
হাজি সাহেব রু করলেন গোলাপ দিয়ে। গোলাপের বর্ণ গন্ধ এইসব নিয়ে প্রচুর উচ্ছাস করে বললেন, গোলাপ হচ্ছে আমাদের জাতীয় ফুল।
তাকে কানে কানে বলা হলো, গোলাপ নয়, জাতীয় ফুল হচ্ছে শাপলা। তিনি হুঙ্কার দিয়ে বললেন, কোন শালায় বলে শাপলা জাতীয় ফুল? কোথায় গোলাপ আর কোথায় শাপলা? কোথায় আইয়ুব খান আর কোথায় খিলি পান! ভাইসব, আপনারা বলেন, শাপলা কি একটা ফুল? শাপলা হচ্ছে একটা তরকারি।
বুঝতেই পারছেন প্রফেশনাল নন এসব লোকদের প্রধান অতিথি করা খুব রিস্কি ব্যাপার।
আবার প্রফেশনালদের নিয়েও কিছু সমস্যা আছে। এরা এই কাজ করতে করতে একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়েন। যা নাকি মাঝে মাঝে জটিলতার সৃষ্টি করে। আমি এরকম একজনকে চিনি। তিনি সভাতে এসেই খোঁজ নেন সভা কতক্ষণ চলবে। সময় জেনে নিয়ে চট করে ঘুমিয়ে পড়েন। দর্শকরা কেউ তা বুঝতে পারে না। সবাই ভাবে চোখ বন্ধ করে গভীর মনোযোগে তিনি শুনছেন। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আধঘন্টা আগে জেগে ওঠেন এবং যথাসময়ে একটি চমত্তার বক্তৃতা দেন। একবার গণ্ডগোল হয়ে গেল। উদ্যোক্তারা বলছে অনুষ্ঠান তিন ঘণ্টার মতো চলবে। সেই হিসেবে তিনি গতার এ অভিভূত হলেন। কিন্তু অনুষ্ঠান দুঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে গেল। তাকে জাগানো তার ভাবভঙ্গি দিশাহারার মতো। যেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। একজন কানে কানে। বলল, স্যার কিছু বলুন। তিনি হুঙ্কার দিলেন, কেন?
আপনি স্যার প্রধান অতিথি।
তিনি এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। দর্শকদের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন উঠল এবং এক সময় সবাইকে হতভম্ব করে তিনি বললেন, যুথির মা, আমাকে আধাকাপ চা দাও।
প্রধান অতিথি প্রসঙ্গে আমার নিজের একটি ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা আছে। বেশ অনেকদিন আগের কথা। একদল ছেলে এসে আমাকে ধরল প্রধান অতিথি হতে হবে। আমি এককথায় রাজি। ওদের বলে দিলাম নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে আমি উপস্থিত থাকব। চারটার সময় যাওয়ার কথা। আমি অবশ্যি চারটার সময় গেলাম না। প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি এদের একটু দেরিতে উপস্থিত হতে হয় এটাই নিয়ম। আমি কুড়ি মিনিটের মতো দেরি করলাম। অনুষ্ঠান তখনো শুরু হয়নি। কিন্তু কী সর্বনাশ! ডায়াসে প্রধান অতিথি বিশেষ অতিথি দুজনই উপস্থিত। এ-কী কাণ্ড! আমি কী করব ভাবছি। উদ্যোক্তাদের একজন এগিয়ে এসে নিচুগলায় বলল, আপনি হচ্ছেন স্যার স্ট্যান্ডবাই প্রধান অতিথি। আসল জন না এলে আপনাকে বসিয়ে দিতাম।
বলো কী তুমি?
কী করব স্যার বলেন, কেউ কথা রাখে না। বলে আসবে কিন্তু আসে না। এইজন্যে স্ট্যান্ডবাই রাখতে হয়। আসেন স্যার, এক কাপ চা খান। চা না খেলে বুঝব আপনি রাগ করেছেন।
গেলাম চায়ের দোকানে। সেখানে আরেকজন স্ট্যান্ডবাই বিশেষ অতিথি বিমর্ষ মুখে বসে আছেন। আমাকে দেখে মুখ কালো করে বললেন, আমি একা এলে একটা কথা হতো। স্ত্রী এবং ছোট শালীকে নিয়ে এসেছি, এদের কাছে কী বলি? আপনি বলুন তো ভাই!
আমি উনাকে কী বলব! আমি নিজেও আমার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছি। জীবনের প্রথম প্রধান অতিথি আর স্ত্রী সেটা দেখবে না, তা কি হয়?
COMMENTS